প্রশান্তির খোঁজে গজনী

- আপডেট সময় : ০৮:০৫:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৫৪ বার পড়া হয়েছে

শীতের শেষ সময়ে দলবেঁধে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছা। পরামর্শক্রমে আমরা ঐক্যমতে পৌছালাম। দূর অজানায় প্রকৃতির নিবিড় অরণ্যে হারিয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি পেতে আমরা আকুল। আমরা ফাগুনের শান্ত শীতল পরিবেশে যাত্রা শুরু করলাম। চারিদিকে সবুজের ঘন আচ্ছাদন। সেই সাথে উঁচু নিচু পাহাড়। সবুজ বনের বুক চিঁড়ে আকাবাকা ও উঁচু নিচু পাহাড়ি রাস্তা। মসৃণ পিচ ঢালা রাস্তা দিয়ে আমাদের বাস চলছে দ্রুত গতিতে। রাস্তার দু পাশে গজারি গাছের সমারোহ। ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে বসন্তের মিষ্টি কিরণ এক রোমাঞ্চকর আমেজের সৃষ্টি করছে। এ যেন এক স্বপ্নীল পরিবেশ। প্রকৃতির কাছাকাছি এক যাদুকরী আবেশ। গাঢ় সবুজ গাছপালা, ছায়াঘন অরণ্য, পাখির কলতানি সেই সাথে পাতা ঝরার মৃদু শব্দ সব মিলিয়ে এক প্রশান্তির পরিবেশ তৈরী করছে। এ যেন হাজার বৈচিত্র্যে ভরপুর এক প্রকৃতিক জগৎ যেখানে প্রাণীরা খুঁজে পায় বাসস্থান আর মানুষ পায় প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতার ছোঁয়া। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবুজের সমারোহ, ঝুলন্ত ব্রিজ, ড্রাগন ট্যানেল, ওয়াজ টাওয়ার, চিড়িয়াখানা, পদ্ম সিড়ি, ডাইনোসর ও জলপরীর ভাস্কর্য এবং গাড়ো পাহাড়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে দেখতে ও জানতে প্রকৃতি প্রেমিদের আনাগোনা বেড়ে চলছে। বলছিলাম শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতীর গজনী অবকাশ কেন্দ্রের কথা। প্রকৃতিক সৌন্দর্যের ঐশ্বর্যময় গজনী শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলায় অবস্থিত। শেরপুর শহর থেকে গজনীর দূরত্ব মাত্র ৩০ কিলোমিটার। যেকোন দিন বিশেষ করে ছুটির দিনে পরিবার, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজন কিংবা সহকর্মীদের নিয়ে শহরের কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ থেকে দূরে এক চিলতে প্রশান্তির খোঁজে নিরিবিলি প্রকৃতির আবেশে হারিয়ে যাওয়ার মনোরম অনুভূতি পেতে চাইলে শেরপুরের গাড়ো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠা ৯০ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত গজনি অবকাশ কেন্দ্রে ঘুরে আসতে পারেন আপনিও। চারিদিকে সবুজের সমারোহ ও বনের অভ্যন্তরে অযত্নে গজিয়ে উঠা বিভিন্ন গুল্ম লতা ও বাহারি নাম ও আকৃতির গাছপালা আপনার মন ভরিয়ে দিবে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে পেয়ে মনকে ভরিয়ে তুলতে গজনীর জুড়ি মেলা ভার। প্রকৃতির একাত্মতায় বেড়ে ওঠা বিভিন্ন পাখ-পাখালির মুক্ত অবস্থায় ছুটে চলা ও সুনসান নিরবতায় পাখির কিচিরমিচির শব্দ এক স্বপ্নিল ও প্রশান্তির ছোঁয়া এনে দেয় মুহূর্তেই। এমন প্রকৃতিক সৌন্দর্যে হারিয়ে যাবে যেকেউ।
যা দেখতে পাবেনঃ- নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি গজনী। গারো, কোট, হাজং, ডালু ও হদি উপজাতি অধ্যুষিত গারো পাহাড়ের পাদদেশে স্বচ্ছ-সুনীল জলের লেক ও দিগন্ত ছোঁয়া সবুজ বনানীর মাঝে গড়ে উঠা পিকনিক স্পট। গহীন জঙ্গল, টিলা, মাঝে সমতল। দু’পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে ছন্দ তুলে পাহাড়ী ঝর্ণার এগিয়ে চলা। পাহাড়, বনানী, ঝর্ণা, হ্রদ এতসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যেও কৃত্রিম সৌন্দর্যের অনেক সংযোজনই রয়েছে গজনী অবকাশ কেন্দ্রে। গজনী প্রবেশের মুখে দেখা যায় মৎস্যকন্যার ভাস্কর্য যার নাম দেয়া হয়েছে জলপরী। সমতল ভূমি থেকে গজনী অবকাশ ভবনে উঠানামা করার জন্য পাহাড় কেটে তৈরী করা হয়েছে দু’শতাধিক সিঁড়িসহ আকর্ষণীয় আঁকাবাঁকা পদ্মসিঁড়ি। যে সিঁড়ির দুপাশে রয়েছে ছায়াশীতল অরণ্য। রয়েছে বিশালাকৃতির ডাইনোসরের ভাস্কর্য। এছাড়াও এখানে রয়েছে পাহাড়ের অভ্যন্তরে ড্রাগন ট্যানেল, কৃত্রিম জলপ্রপাত, কৃত্রিম দ্বীপ ও দ্বীপে যাতায়াতের জন্য রয়েছে স্টিল রোপের ওপর নির্মিত দোদুল্যমান সেতু। পাহাড়ের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রাপ্তে যেতে রয়েছে ঝুলন্ত সেতু ও ক্যাবল কার। সেই সাথে কৃত্রিম লেক আর লেকে ভাসমান অসংখ্য স্পিডবোট ও প্যাডেল বোড এবং আকর্ষণীয় ময়ূরপংঙ্খী নাও, উন্নতমানের দ্বিতল রেস্ট হাউজ, উপর থেকে একনজরে ঘন অভয়ারণ্য দেখার জন্য রয়েছে ৬৪ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট সুউচ্চ সাইড ভিউ টাওয়ার, ওয়াটার কিংডম, আলোকের ঝর্ণাধারা ও সুইমিংপুল, ছোট্ট পরিসরে রয়েছে চিড়িয়াখানা, চিড়িয়াখানায় রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। নজরুল স্মৃতিফলক ও বর্নিল সংযোগ সেতু এবং ফটো উঠানোর জন্য প্রকৃতির পাশাপাশি কৃত্রিম বিভিন্ন অনুষঙ্গ রয়েছে এখানে। এছাড়াও এখানে দেখা যায় পাহাড়ের ঢালে, গায়ে কিংবা পাহাড়ের চূড়ায় সারি সারি শাল, সেগুন, মহুয়া, গজারী, আকাশমনি, ইউকেলিপটাস, মিলজিয়ামসহ আরো নাম না জানা কত শত পাহাড়ি গাছ। বনফুল ও ছায়াঢাকা বিন্যাস যেন বিশাল ক্যানভাসে সুনিপুণ শিল্পীর রঙ-তুলির আঁচড়। যা প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে দোলা দেয়। তাই একেবারে কাছ থেকে প্রকৃতির সুবিন্যস্ত রূপ দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটে আসেন গজনীতে।
যেভাবে যাবেনঃ- ঢাকাসহ বাংলাদেশের যেকোন জায়গা থেকে খুব সহজেই আসা যায় গজনীতে। গজনীতে আসার জন্য সড়ক পথে যাতায়াত খুব সহজ। গজনী অবকাশ পর্যন্ত রয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগের মসৃণ পিচঢালা পথ। গজনীতে আসার জন্য প্রথমে আপনাকে আসতে হবে শেরপুরে। এরপর সেখান থেকে সিএনজি করে আসতে পারবেন নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি গজনীতে। এছাড়াও শহরের কোলাহলকে পিছনে ফেলে অরণ্যের নিরবতাকে আপন করে নিতে মোটরসাইকেল বা মাইক্রোবাসে প্রবেশ করতে পারবেন গজনীতে।
যখন যাবেনঃ- বছরের যেকোন সময় বা সারা বছরই পর্যটকের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায় গজনীতে। তবে বিশেষ করে শীতকাল ভ্রমনের জন্য মোক্ষম সময়। শীতকালে শিক্ষা সফর কিংবা আনন্দ ভ্রমনের জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এবং বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা আসেন আনন্দ উপভোগের জন্য। তবে বনের প্রকৃতি সেজে ওঠে বসন্তকালে। গাছে গাছে নতুন ফুল ও পাখিদের কিচিরমিচির আওয়াজ যেন এক প্রশান্তির আমেজ সৃষ্টি করে।
যেখানে থাকবেনঃ- গজনী অবকাশ কেন্দ্রের রেস্ট হাউজ ব্যবহার করতে পারবেন। এছাড়াও ঝিনাইগাতি শহর কিংবা শেরপুর সদরে রাত্রি যাপন করতে পারবেন।
যা সঙ্গে আনবেনঃ- মনোমুগ্ধকর পাহাড় ও অরণ্য অবলোকন করতে করতে হয়তো আপনি পিপাসার্ত হতে পারেন সেজন্য পান করার জন্য পানি অবশ্যই সঙ্গে নিবেন। যদিও এখানে পেশাদার ফটোগ্রাফার আছে তদ্রূপ আপনি ফটো তুলার জন্য ক্যামেরা আনতে পারেন৷ ঘরে বানানো মুখরোচক খাবার সঙ্গে নিতে পারেন৷ এছাড়া পাহাড়িদের হাতে বানানো বিভিন্ন তৈজসপত্র ও পাহাড়ি ফল সংগ্রহ করতে সঙ্গে থলে বা ব্যাগ নিতে পারবেন৷
যা করবেন নাঃ- বনের মুক্ত প্রাণীদের খাবার দিবেন না। যেহেতু এরা বন্য প্রাণী তাই এদের অতি নিকটে গেলে তেড়ে আসতে পারে। প্লাস্টিক জাতীয় উচ্ছিষ্টা বা পলিথিন ফেলবেন না। প্লাস্টিক ও পলিথিনে বনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বনে বিভিন্ন জাতের গাছ আছে। এসব গাছের ডাল ভাঙবেন না। এবং পাতা ছিঁড়বেন না। মোটরসাইকেল বা গাড়ির হর্ণ বাজাবেন না। সঙ্গে শিশু থাকলে তাদের হাতছাড়া করবেন না। বনে ধুমপান করা থেকে বিরত থাকুন।