টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) সংসদীয় আসনে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চলাকালেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী। তার এই সিদ্ধান্তে এলাকায় তার নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মাঝে নেমে এসেছে শোক, ক্ষোভ ও চরম হতাশা। আবেগে ভেঙে পড়েছেন কর্মী-সমর্থকরা।
গত দেড় বছর ধরে ঘর-সংসার, স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়স্বজন ছেড়ে নিজের অর্থ ব্যয় করে মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে রাজনীতি করেছেন বলে জানান মধুপুর উপজেলার আউশনারা ইউনিয়নের লাল মিয়া। তিনি বলেন,“স্থানীয় সন্তান ও কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে জনপ্রিয় হওয়ায় ভেবেছিলাম তিনি দলীয় মনোনয়ন পাবেন। মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ার খবরে আমরা শকড হই। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতীক পাওয়ার পর দ্বিতীয় দিন দুপুর পর্যন্ত প্রচার করেছি। হঠাৎ খবর এলো—নেতা নির্বাচন থেকে সরে যাচ্ছেন। মাথায় যেন বাজ পড়লো।”কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
মধুপুরের আলোকদিয়ার গাংগাইর এলাকার তোতা হাউমাউ করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“নেতা হয়ে এমন বেঈমানি করলেন কেন? কোথায় যাবো আমরা? টাকা দরকার হলে বলতেন। নির্বাচন শুরু না করেই মাঠ ছেড়ে দিলেন। আপনার নাম ইতিহাসে মীরজাফরের পাশে লেখা থাকবে।”
ধনবাড়ী উপজেলা কৃষক দলের সাবেক সভাপতি ও যদুনাথপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল হাই জানান, শুক্রবার সকাল থেকেই লিফলেট বিতরণ ও ভোটের প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। নামাজের পর মধুপুরে এসে খবরটি শুনে হতবাক হয়ে যান।
তিনি বলেন, “যদুনাথপুরসহ ধনবাড়ীতে মোহাম্মদ আলীর বড় অবস্থান তৈরি হয়েছিল। তার সঙ্গে দীর্ঘ পথচলা হঠাৎ থেমে গেল। নিজের রাজনীতি নিয়েও এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছি।”
মধুপুর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাবেক মহিলা কাউন্সিলর হামিদা খাতুন বৃহস্পতিবার রাতেই তার ওয়ার্ডে কেন্দ্র কমিটি গঠন করেন। শুক্রবার সকালেও নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত ছিলেন। সকাল ১০টার দিকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর খবর পেয়ে তিনিও হতাশ হয়ে পড়েন। এর আগে তিনি এমন পরিস্থিতির কোন টের পাননি।
মধুপুর আদালত পাড়ায় প্রধান সমন্বয়ক আনোয়ার হোসেনের বাসায় সকাল থেকেই নেতাকর্মীদের ভিড় জমে। বিকাল ৪টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন তারা।সেখানে অবস্থান করা অনেকে জানান,
“ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষ থেকে অনেক নেতা যোগাযোগ করেছিলেন, কিন্তু আদর্শের রাজনীতি করি বলে মোহাম্মদ আলীর সাথেই ছিলাম। এখন কোনো দিকনির্দেশনা নেই—কি করবো বুঝতে পারছি না।”
একই অবস্থার কথা জানিয়ে নেত্রী সোনিয়া, শোলাকুড়ির তরুণ নাহিদ, পৌর এলাকার চাড়ালজানীর জলিল মন্ডল, টেংরির শামসুর রহমান স্বপনসহ এক শারীরিক প্রতিবন্ধী সমর্থকও কান্নায় ভেঙে পড়েন। চোখ মুছতে মুছতে তারা নানা আক্ষেপ আর হতাশার কথা জানান।
উল্লেখ্য, বিএনপির দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক আইন বিষয়ক সম্পাদক এই অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী। স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের যুগ্ম সম্পাদক ও জিয়া পরিষদের ডিরেক্টর পদ থেকে সদ্য বহিষ্কৃত হয়েছেন।
এ আসনে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য এর আগে এই আসন থেকে দুইবার নির্বাচন করা ফকির মাহবুব আনাম স্বপন।
একাধিক সূত্র জানায়, দলীয় প্রার্থী ফকির মাহবুব আনাম স্বপনের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের পরই মোহাম্মদ আলী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঢাকাসহ টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় বৈঠকের পর শুক্রবার সকালে আনোয়ার হোসেনের বাসায় চূড়ান্ত আলোচনা হয়। স্বপন ফকির চলে যাওযার পর খবর ছড়িয়ে পড়লে আবেগে উত্তেজিত কর্মী-সমর্থকরা সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বাইরে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে কর্মীরা মোহাম্মদ আলী কে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে নিরাপত্তার জন্য কর্মীদের বেষ্টনীতে মোহাম্মদ আলীকে সেখান থেকে নামিয়ে গাড়িতে তুলে বাসায় পাঠানো হয়।
বিএনপির মধুপুর উপজেলা শাখার সাবেক সহ-সভাপতি জয়নাল আবেদীন খান বাবলু জানান, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।
এদিকে ধানের শীষের পক্ষে যোগদান করা এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মোহাম্মদ আলী একটি প্রভাবশালী গ্রুপের চাপে পড়ে দলের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে ভুল করেছেন। সেই ভুল বুঝতে পেরে তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ধানের শীষের প্রার্থী ফকির মাহবুব আনাম স্বপনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, মোহাম্মদ আলী প্রার্থীতা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল আসতে বিলম্ব করে ছিলেন। তাই প্রার্থীতা প্রত্যাহারের দিন প্রত্যাহার করতে পারেননি। পরে দলীয় প্রতীক ধানের শীষের জন্য আমার প্রতি আস্থা রেখে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠ ত্যাগ করেছেন।
এস.এম শহীদ