ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর টাঙ্গাইল জেলায় যে চিত্রটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত—তা হলো এক আসনের তিন সন্তান, তিনটি পৃথক আসন থেকে সংসদ সদস্য এবং তাদের মধ্যে দু’জনের মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া। মূল শিকড় টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভুঞাপুর), কিন্তু বিজয়ের পতাকা উড়েছে টাঙ্গাইল-১, টাঙ্গাইল-২ ও টাঙ্গাইল-৫—তিন আসনেই।
তিন আসন, এক শিকড়-
টাঙ্গাইল-১ (মধুপুর-ধনবাড়ী) আসনে নির্বাচিত হয়েছেন ভুঞাপুরের কৃতি সন্তান ফকির মাহবুব আনাম স্বপন। টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভুঞাপুর) আসনে বিজয়ী হয়েছেন সাবেক মন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু। আর টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
পিন্টু ও টুকু সহোদর; তাদের বাড়ি গোপালপুর উপজেলার অরজুনা গ্রামে। অন্যদিকে স্বপন ফকির ভুঞাপুর উপজেলার নিকরাইল গ্রামের বিখ্যাত রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান—মকবুল হোসেন ফকিরের ছেলে, সাবেক মন্ত্রী আফাজ উদ্দিন ফকির এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব লোকমান ফকিরের ভাতিজা।
দুই মন্ত্রী, নতুন প্রত্যাশা-
নির্বাচিত এই তিন এমপির মধ্যে দু’জন ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়েছেন।
সালাম পিন্টু অতীতে শিক্ষা উপমন্ত্রী ছিলেন। এবার প্রথমবারের মতো এমপি হয়ে মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন স্বপন ফকির ও সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
মঙ্গলবার শপথ নিয়ে স্বপন ফকির ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে টুকু কৃষি, খাদ্য,মৎস্য ও পশু সম্পদ এই তিনটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে টাঙ্গাইলের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় রচিত হলো—একই শিকড়ের দুইজন মন্ত্রী।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা-
স্বপন ফকিরের রাজনৈতিক পথচলা দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়ের। ২০০১ সাল থেকে টাঙ্গাইল-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া শুরু করেন। ২০০৮ সালেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০১৪ ও ২০২৪ সালে দলের সিদ্ধান্তে নির্বাচন করেননি। ২০১৮ সালে ব্যাংকিং জটিলতায় মনোনয়ন পাননি। অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রায় ৬০ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে সংসদে প্রবেশ করেন এবং মন্ত্রিসভায় স্থান করে নেন।
একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—এই তিন নেতাই নিজস্ব শিকড়ের আসন টাঙ্গাইল-২ থেকেও কোনো না কোনো সময়ে নির্বাচন করেছেন। স্বপন ফকির স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সেখানে পরাজিত হয়েছিলেন। সালাম পিন্টু ওই আসন থেকে জয়ী হয়ে শিক্ষা উপমন্ত্রী হয়েছিলেন। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে টুকুও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়েছিলেন, যদিও তখন জয় পাননি। কিন্তু এবার এমপি নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রিত্বের স্বাদ পেলেন।
আনন্দে উদ্বেলিত টাঙ্গাইল-
গোপালপুর-ভুঞাপুরের মানুষজনের কাছে এটি গর্বের মুহূর্ত। একই শিকড়ের তিনজন সংসদ সদস্য, তার মধ্যে দুইজন মন্ত্রী—এ যেন রাজনৈতিক ঐতিহ্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত।
দলমত নির্বিশেষে টাঙ্গাইলবাসীর মধ্যে উচ্ছ্বাস স্পষ্ট। অনেকেই মনে করছেন, এই ঐক্যবদ্ধ সাফল্য জেলার উন্নয়ন সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। অবকাঠামো, শিক্ষা, কৃষি, প্রযুক্তি ও যোগাযোগ খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি এখন সময়ের দাবি।
টাঙ্গাইলের তিন আসনে তিন এমপি—কিন্তু শিকড় এক। আর সেই শিকড়ের শক্তিই যেন আজ জেলার রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।