হালুয়াঘাট গারো পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে দূর থেকে দেখলাম ভারতের পাহাড়ে গাছপালার মাথায় আগুন জ্বলছে। বসন্তের শুরুতে গাছ পালা নতুন রূপে সাজে, কিন্তু এই সৌন্দর্য ছিল কিছুটা ভিন্ন। পুরো গাছের মাথায় আগুন জ্বলছে(লাল)। দূর থেকে আন্দাজ করা একটু কঠিন হচ্ছিল, পাতা নাকি ফুল। কাঁটাতারের বেড়া প্লাস, পাশেই বিএসএফের ক্যাম্প। কাছে গিয়ে দেখা বেশ বিপজ্জনক। তবুও ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেলাম। পাহাড়ের উপরে গাছ, নিচে ধান খেত। যতদূর পারি কাছে গিয়ে নিচ থেকে ফোনে জুম করে ছবি তুললাম। কিন্তু ছবি তুলে মন ভরলো না।
মনের মতো ছবি তুলতে না পেরে অস্থির লাগছিল। কয়েকটা ছবি তুলে ফেরত আসছিলাম আর চার পাশে খেয়াল করে আসছিলাম। আশেপাশে কোনো জায়গায় দেখা যায় কিনা। ফেরার পথে পেয়ে বাংলাদেশের লোকালয়ে। রাস্তার পাশে বেড়া হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এই গাছের ডাল। ফুলও আসছে বেশ।
স্থানীয় আদিবাসীদের(গারো)জিজ্ঞেস করলাম এই গাছের নাম কী? কেউ সঠিক নাম বলতে পারলো না। জানার কৌতূহল নিয়ে সেখান থেকে ফেরৎ আসলাম। স্থানীয়রা বলছিল, এই গাছের ডাল মাটিতে পুঁতে রাখলে গাছ হয়। সেই ভাবনা থেকে কয়েকটা ঢাল নিয়ে আসলাম। ডাল নিয়ে এসে বেশ যত্ন করে লাগালাম। ডাল থেকে আর গাছ হল না।
এর পর থেকে বন বাদাড়ে যেখানেই যাই সেখানেই লাল উদাল খুঁজি। হালুয়াঘাট থেকে ফেরার কিছু দিন পর গেলাম সুসং দূর্গাপুর । সেখানে গিয়ে সব থেকে উচু পাহাড়ে দেখা হল লাল উদালের সাথে, তখন গাছে খুব বেশি ফুল ছিল না। পুরো গাছে শিমের মতো লাল লাল ফলে ভরা। কিছু ফল সংগ্রহ করে নিয়ে আসলাম। স্থানীয়দের গাছে শুনলাম এই ফল নাকি সেদ্ধ করে খাওয়া যায়।
গারো পাহাড়ের মাটি আর আমাদের মধুপুর গড়ের মাটি একই। মধুপুর গড়ে এসে লাল উদাল খুঁজতে লাগলাম। যেহেতু পাতা দেখিনি, শুধু ফুল আর ফল দেখেছি, এর জন্য গাছ চেনা বেশ কঠিন হচ্ছিল। এর জন্য আমাকে ফুলেল সিজন পযর্ন্ত অপেক্ষা করে যেতে হবে। এক বছর অপেক্ষা করে বসন্তে যখন গাছের পাতা ঝরে নতুন পাতার সাথে ফুল ফুটা শুরু হয় তখন খুঁজতে শুরু করলাম লাল উদাল।
গোধূলী, বাইকে করে যাচ্ছিলাম। আমার চোখ বনের চারদিকে, গাছপালার উপরে।হঠাৎ গাছের মাথায় আগুন দেখতে পেলাম। চলন্ত বাইক ,জরুরি কাজ থাকায় আর নামলাম না। আমার বুঝতে বাকি রইলো না, এটা লাল উদালই হবে। পরদিন দেখতে আসলাম। গাছে ফুল দেখে নিশ্চিত হলাম এটাই লাল উদাল। যেহেতু একটা গাছ পেয়ে গেছি, বনে আরো গাছ আছে।
আরো খুঁজতে লাগলাম। কয়েকদিন খুঁজে আরো তিনটা গাছের সন্ধান পেলাম। প্রতিটা গাছে অসংখ্য ফুল। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন গাছে আগুন জ্বলছে। গড়ের ভেতরে পীরগাছা,দোখলা,পেগামারির আশেপাশে এই চারটি গাছের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে, যে কোনো সময় গাছ গুলো কাটা পড়ে যেতে পারে।
লাল উদালের আবাসভূমি হচ্ছে পাহাড়ি অঞ্চলে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম, বান্দরবন, রাঙামাটি সহ ভারতের পাহাড়ে দেখা যায়। যেই কারণেই লাল উদালের সঙ্গে আমাদের খুব একটা চেনা জানা নেই। অঞ্চল ভেদে অন্যান্য নাম নহিচিচা/সামারি/মুলা/পিসি নামেও ডাকে। বৈজ্ঞানিক নাম Firmiana colorata (Roxb.)R.Br. সমনাম : Sterculia colorata Roxb. Malvaceae পরিবারের গাছ। পূর্বে Sterculiaceae পরিবারের আওতাভুক্ত ছিল।
লাল উদাল গাছ লম্বায় ২০ মিটার বা তার চেয়েও উঁচু হতে পারে। শীতে সব পাতা ঝরে গিয়ে গাছ একদম উদোম হয়ে পড়ে। বসন্তকালীন গাঢ় লাল ফুল এবং পরবর্তীতে গাঢ় লাল রঙের শিমের মতো ফল হয় । ২০১২ সালের বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-৪ অনুযায়ী এ প্রজাতি সংরক্ষিত। লাল উদাল গাছের কাঠ বাদামি রঙের, কাঠ সাধারণত নরম ও হালকা। এই গাছের বাকল থেকে এক ধরনের আঁশ পাওয়া যায়, সে আঁশ দিয়ে মোটা রশি তৈরি করা হতো। বন উজাড়সহ নানা কারণে গাছটি আবাসস্থল হারিয়েছে। এখন মহাবিপন্নের দলে।
মধুপুর গড়ের স্থানীয় আদিবাসী(গারো) সংগীত শিল্পী ওয়ারী নকরেক মারাক বলেন,গারো ভাষায় লাল উদালকে সেংসু/ সেংসু বিথি বলে। এই গাছের ফুলের ফল যখন শিমের মত বীজ হয় এবং মাটিতে পরে তখন এর বীজ খাওয়া যায়। স্বাদ বাদামের মতো। এর ঔষধি গুণ আছে কিনা জানি না তবে ছোট বেলায় আমরা প্রচুর খেয়েছি। বীজ খেতে কিন্তু অন্যান্য বাদাম জাতীয় খাবারের মতই সুস্বাদু।
রাতুল মুন্সী
প্রাণ, প্রকৃতি পরিবেশ বিষয়ক লেখক-