মো. সাইফুল ইসলাম : বাংলার মাঠ-ঘাট, নদী-নালা আর সবুজ ফসলের সঙ্গে মিশে আছে কৃষকের ঘাম, শ্রম ও ত্যাগের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের এক নীরব অধ্যায়ের নাম আমার আব্বা। তিনি কোনো বড় কর্মকর্তা নন, কোনো রাজনৈতিক নেতা নন, কোনো খ্যাতিমান ব্যক্তিও নন। তিনি একজন সাধারণ কৃষক। কিন্তু তাঁর এই সাধারণ পরিচয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে অসাধারণ এক সংগ্রামের গল্প, যা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো জাতির আত্মনির্ভরতার গল্প।
আজ যখন আমি আমার আব্বাকে আনারস ক্ষেতের ভেতর মাথায় ফলের বোঝা বহন করতে দেখি, তখন বুঝতে পারি একটি পরিবারের সুখ-স্বপ্ন কতটা কঠোর পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। একটি আনারস বাজারে পৌঁছানোর আগে কত শ্রম, কত সময়, কত দুশ্চিন্তা এবং কত ত্যাগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা আমরা অনেকেই উপলব্ধি করি না। কৃষকের সন্তান হিসেবে আমি জানি, একটি ফলের পেছনে শুধু মাটির উর্বরতা নয়, একজন বাবার নির্ঘুম রাত এবং পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধও জড়িয়ে থাকে।
আমাদের সমাজে কৃষককে প্রায়ই অবহেলার চোখে দেখা হয়। অথচ এই কৃষকরাই দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। তাঁরা মাঠে না গেলে বাজারে খাদ্য পৌঁছায় না, অর্থনীতির চাকা সচল থাকে না এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাও বজায় থাকে না। কৃষক শুধু ফসল উৎপাদন করেন না; তিনি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তাঁদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন আজও নিশ্চিত হয়নি।
আমার আব্বা কখনো বড় বড় বক্তৃতা দেননি, কিন্তু তাঁর জীবন আমাকে এমন শিক্ষা দিয়েছে যা কোনো বইয়ের পাতায় পাওয়া যায় না। তিনি শিখিয়েছেন সৎভাবে বাঁচতে, কঠোর পরিশ্রম করতে, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে এবং নিজের দায়িত্ব থেকে কখনো পিছিয়ে না যেতে। সংসারে অভাব ছিল, কষ্ট ছিল, সীমাবদ্ধতা ছিল; কিন্তু তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। নিজের কষ্টকে আড়াল করে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
আজকের তরুণ সমাজের অনেকেই দ্রুত সফলতার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু প্রকৃত সফলতার ভিত্তি যে অধ্যবসায়, ধৈর্য ও কঠোর পরিশ্রম—সেই শিক্ষা আমি আমার আব্বার কাছ থেকেই পেয়েছি। তিনি আমাকে বুঝিয়েছেন, জীবনে শর্টকাট বলে কিছু নেই। মাটিতে বীজ বপনের পর যেমন ধৈর্য ধরে ফসলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তেমনি জীবনের সাফল্যও সময়, শ্রম এবং ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়।
রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও কৃষকদের গুরুত্ব অপরিসীম। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী ও স্বাধীন হতে পারে, যখন সে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। খাদ্যের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্র কখনো প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হতে পারে না। তাই কৃষকদের উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং কৃষি খাতকে লাভজনক করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। পরিবেশ, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে কৃষি সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে কৃষককে সম্মান করা মানে রাষ্ট্রের ভিত্তিকে শক্তিশালী করা।
আমার আব্বার মতো লাখো কৃষক পিতা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিদিন নীরবে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। তাঁদের যুদ্ধ অস্ত্রের নয়, উৎপাদনের; ধ্বংসের নয়, সৃষ্টির। তাঁদের হাতে থাকে কোদাল, কাস্তে কিংবা ফলের বোঝা; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই হাতেই গড়ে ওঠে দেশের অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রা।
একজন সন্তানের কাছে তার বাবা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আমার কাছেও আব্বা শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি আমার সাহস, আমার শিক্ষা, আমার আদর্শ এবং আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তাঁর ঘামে ভেজা মুখ আমাকে দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়, তাঁর সংগ্রাম আমাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।
আজকের এই লেখনীর মাধ্যমে আমি শুধু আমার আব্বাকেই নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষক পিতাকে সম্মান জানাতে চাই। কারণ তাঁদের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন, আর তাঁদের শ্রমের ওপর নির্ভর করে আছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।
মাটির মানুষ আমার আব্বা। তাঁর হাতে মাটির গন্ধ, কপালে শ্রমের ঘাম, আর হৃদয়ে পরিবারের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ এবং সবচেয়ে বড় প্রেরণা।