টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা। শাল আর গজারি বনে ঘেরা ঐতিহ্যবাহী একটি উপজেলা। এখানকার প্রধান অর্থকরি ফসল হলো আনারস। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে এ উপজেলার ইদিলপুরে আনারসের চাষ শুধু হলেও বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে বানিজ্যিক ভাবে এর চাষাবাদ ।
এ বছর আনারসের উৎপাদন হয়েছে অন্য বছরের তুলনায় বেশি। আনারসের ভরা মৌসুমে এসে অধিক বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে আনারস বাগানে একসাথে পেকে যাওয়ায় বাজারে আমদানি বেশি। আর এ কারণে বাড়তি গ্রাহক না থাকায় দাড় পাচ্ছে না কৃষকেরা। আর এ কারণে অসন্তুষ্ট চাষিরা।
শালবন আর আনারসের জনপদ বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাল মাটির মধুপুর গড়াঞ্চল। এখানকার আবহাওয়া ও মাটির প্রকৃতি আনারস চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী হওয়ায় আনারস চাষ করা যায় অতি সহজে । ভূমি প্রকৃতি সমতল ও উঁচু হওয়ায় এখানে বন্যার পানি ওঠে না। আবার ‘বাইদ’ বা ছোট নালা দিয়ে পানি সহজে সরে যাওয়ায় জলাবদ্ধতাও হয় না। মাটির বিশেষ গুণের কারণে এখানে আনারস ও কলার ফলন হয় চমৎকার। উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মধুপুর উপজেলায় প্রায় নয় থেকে সাড়ে নয়শত কোটি টাকার আনারস বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু যদি সঠিক সময়ে বিক্রি করতে না পারা যায় তাহলে লোকসানের ঝুঁকির মধ্যে পরবে অনেক কৃষক। আর তেমনি চিত্র ইতোমধ্যে চোখে পরছে বিভিন্ন বাজারে গিয়ে। আর
যদি সঠিক প্রক্রিয়া করা যায় ,এই বিশাল সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। জুন, জুলাই, আগস্ট মাস আনারসের ভরা মৌসুম চলছে। আর এরই মাঝে শুরু হয় অতি বৃষ্টি। বৃষ্টিপাত অধিক্যের কারণে বাগানে একসাথে আনারস পেকে যাওয়ায় বাজারে আমদানি বেড়েছে চাহিদার তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ । তাই বিপাকে পরেছে হাজারো কৃষক। ফলে গত বছরের তুলনায় কম দামে চাষিদের আনারস বিক্রি করতে হচ্ছে।
উপজেলার মহিষমারা গ্রামের কৃষক ছানোয়ার হোসেন জানান, এ বছর গত বছরের তুলনায় আনারস চাষ হয়েছে বেশি। আর ভরা সিজনের সময় অতিবৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে বাগান ভরে আনারস পেকে যাচ্ছে। তাই বাজারে আমদানি বেশি। কিন্তু গ্রাহক আমদানি তুলনায় বাড়েনি। রাসায়নিকের ব্যবহারে দাম কমে যাওয়ার অভিযোগটি সত্য নয়। নিরাপদ আনারস চাষের জন্য আমরা কৃষকরা দিনরাত কাজ করছি।
শালিকা গ্রামের আনারস চাষি জাহিদুল ইসলাম জানান, আনারস উঠার মৌসুমের শুরু থেকেই বৃষ্টির কারণে বেশি পরিমানে আনারস পেকে যাওয়ায় বাজারে আমদানি বেড়েছে। আর এ কারণে গত বছরের চেয়ে দাম একটু কম পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু লোকসান হচ্ছে না।
জলছত্র বাজারের আড়ৎদার মো. মনির হোসেন বলেন, আমরা এই বাজার থেকে সারা বছরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আনারস,কাঁঠাল, কলাসহ বিভিন্ন কাঁচামাল পাঠাই। এ বছর শুরুতে আনারসের বাজার ভালো থাকলেও বর্ষা মৌসুমে বেশি পরিমানে বৃষ্টি হওয়ায় এখন দাম একটু কম। তাছাড়া বাগান ভর্তি আনারস পেকে যাওয়ায় বাজারে আমদানি বেড়েছে। পাইকার আগের মতোই। তাই দাম বাড়ছে না।
মহিষমারা গ্রামের কৃষক সাজ্জাদ রহমান জানান, আনারস চাষীরা মুলত আনারসের আকার বড় করতে প্যানোফিক্স, ক্রপকেয়ার,বোরণ নামক গ্রোথ হরমোন ব্যবহার করা হয়। যার ফলে আনারসের আকার বৃদ্ধি পায়। কিন্তু কিছু কিছু কৃষক এর মাত্রা অতিরিক্ত স্প্রে করার কারণে আনারস পাকিয়ে বাজারজাত করে।
নাম প্রকাশে কয়েকজন জানিয়েছেন, এসব ব্যবহারে অপরিপক্ব গাছেও ফল আসে। কেউ কেউ বলেন, স্বাভাবিক ভাবে ২৪ মাসে যেখানে একটি গাছে ফল ধরে কিন্তু এসব ব্যবহারের কারণে সেখানে ১৮ মাসেই চারা গাছে ফল ধরানো যায়। স্থানীয়ভাবে এসব মেডিসন প্রয়োগকে চাষিরা ‘গর্ভবতী’ নামে অভিহিত করেন।
এ বিষয়ে মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মমতাজ বেগম বলেন, অন্যান্য পচনশীল কৃষি পণ্যের মতই আনারসের বাজারো আবহাওয়ার উপর নির্ভরশীল। গত বছরের তুলনায় এ মৌসুমে আনারসের দাম কম থাকার মূল কারণ হলো অতি বৃষ্টিতে একসাথে বাগান ভরে আনারস পেকে যাওয়া। আমদানি বেশি গ্রাহক আগের মতোই হওয়া। রাসায়নিকের ব্যবহারে গ্রাহক হাড়ানোর ও দাম কমে যাওয়ার অভিযোগ সত্য নয়। তবে স্বাদের কিছুটা তারতম্য হওয়াটা স্বাভাবিক। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিরাপদ খাদ্য প্রকল্প ভিত্তিক ও প্রকল্পের বাইলে মোটিভেশনাল কর্যক্রমের আওতায় মধুপুর কৃষি অফিসের সকল কর্মকর্তাগণ সুষম সার ও অনুমোদিত মাত্রায় রাসায়নিক প্রয়োগে নিয়মিত পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন।
কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, দেশের অন্যতম আনারস উৎপাদনের এলাকা মধুপুরে চলতি মৌসুমে উপজেলায় মোট ৬ হাজার ৬৩৫ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ক্যালেন্ডার (জায়ান্ট কিউ) জাতের আনারস ৪ হাজার ৩০৭ হেক্টরে, জলডুগি ২ হাজার ৩১৮ হেক্টরে এবং এমডি-২ জাতের আনারস ১০ হেক্টরে চাষ করা হয়েছে। এ মৌসুমে প্রায় আড়াই লাখ টন আনারস উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।