জীবনঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা
ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের সাঁকো ও কাদায় ডোবা কাঁচা রাস্তায় দুর্ভোগে ৯ গ্রামের মানুষ
- আপডেট সময় : ১০:১৪:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬ ৩৫ বার পড়া হয়েছে

কাঁচা রাস্তা কাদায় একাকার। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও আবার নড়বড়ে কাঠের সাঁকো। সেই সাঁকো পার হয়েই প্রতিদিন স্কুলে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয় রোগী, কৃষক, ব্যবসায়ীসহ প্রায় ৯ গ্রামের হাজারো মানুষকে। সামান্য বৃষ্টি হলেই বন্ধ হয়ে যায় স্বাভাবিক চলাচল।
এমন দুর্ভোগের চিত্র টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার শোলাকুড়ী ইউনিয়নের কাটাজানী, পূর্ব কাটাজানী, পোনামারী, কেজাই, নয়াপাড়া, বন্দরিয়া, কাকড়াগুনি, সাধুপাড়া, জালাবাদা, বেধুরিয়াসহ আশপাশের এলাকার মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে এ সড়ক ব্যবহার করেন। বর্ষাকালে এসব এলাকার মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি বনাঞ্চলের লাল মাটির প্রত্যন্ত এ এলাকায় রয়েছে কাটারজানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাটারজানী উচ্চ বিদ্যালয় ও কাটারজানী বাজার। এসব স্থানে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান সংযোগ সড়ক এখনো কাঁচা। সামান্য বৃষ্টিতেই লালমাটির রাস্তা পিচ্ছিল ও কাদাময় হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহনেও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, জালাবাদা থেকে কাটারজানী বাজার পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার কাঁচা রাস্তার মাঝখানে দোয়ারিয়া বিলে রয়েছে একটি কাঠের সাঁকো। স্থানীয়দের নিজস্ব অর্থায়ন ও স্বেচ্ছাশ্রমে নির্মিত সাঁকোটি দীর্ঘদিনের পুরোনো হওয়ায় বর্তমানে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন এ সাঁকোর ওপর দিয়ে স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ, ও শিক্ষার্থীরা চলাচল করে।
সাঁকো পার হয়েই স্কুলে
দোয়ারিয়া বিলে ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের সাঁকো পেরিয়েই প্রতিদিন কাটারজানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাটারজানী উচ্চ বিদ্যালয়ে যেতে হয় অনেক শিক্ষার্থীকে। সাঁকোটি পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কায় আতঙ্কে থাকেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

অভিভাবক আব্দুল হক বলেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে আমাদের ভয় হয়। বর্ষাকালে রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ থাকে যে নিয়মিত স্কুলে পাঠাতে পারি না। কাদায় পড়ে গিয়ে মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীরা আহতও হয়। কাঠের সাঁকো দিয়ে পার হওয়ার সময়ও সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়। আমরা চাই, দ্রুত কাঁচা রাস্তাগুলো পাকা করা হোক এবং ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোর স্থলে একটি স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণ করা হোক।
স্থানীয় বাসিন্দা ফরিদ মিয়া বলেন, পাকা রাস্তা না থাকায় এলাকার মানুষ অনেক আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তবে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হয় সন্তানদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে। কখন সাঁকো থেকে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে, সেই ভয় সবসময় থাকে।
দোয়ারিয়া গ্রামের হরমুজ আলী বলেন, সাঁকোটি যে কোনো সময় ভেঙে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত এখানে স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণ না করা হলে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু শিক্ষার্থী নয়, সড়কের বেহাল দশায় কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কাঁচা ও কর্দমাক্ত সড়কের কারণে উৎপাদিত কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে নেওয়া যায় না। বর্ষাকালে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে কিংবা মাথায় করে পণ্য বাজারে নিতে হয়। এতে উৎপাদন খরচের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শুধু দোয়ারিয়া বিলে কাঠের সাঁকো নয়, কাটারজানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পোনামারী হয়ে ভাঙ্গুনী বাজার পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এবং হরিণধরা বা জার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার সড়কের বড় অংশ কাঁচা ও কর্দমাক্ত।
কাটারজানী বাজারের চা বিক্রেতা ইন্নছ আলী বলেন, নির্বাচনের সময় গাড়ি চলাচলের জন্য রাস্তা সাময়িকভাবে মেরামত করা হয়েছিল। কিন্তু বছরের বেশ কয়েক মাস বাজারে ঠিকমতো পণ্য আনা যায় না। গাড়ি চলাচল করতে না পারায় পণ্যের দামও বেড়ে যায়।
শোলাকুড়ী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রাজ মাহমুদ বগা বলেন, কাটারজানী এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নবঞ্চিত। কাঁচা রাস্তা ও জরাজীর্ণ সাঁকোর কারণে কৃষকরা উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে পারেন না। জালাবাদা-কাটারজানী বাজার সড়ক এবং পোনামারী-ভাঙ্গুনী বাজার হয়ে হরিণধরা বাজার পর্যন্ত সড়ক পাকাকরণসহ দোয়ারিয়া বিলে স্থায়ী সেতু নির্মাণ আমাদের দাবী।
কাটারজানীর প্রবীণ বাসিন্দা আনিস মিয়া বলেন, একটি পাকা রাস্তা ও একটি ব্রিজের জন্য যুগ যুগ ধরে কষ্ট করছি। একটু বৃষ্টি হলেই আমরা প্রায় গৃহবন্দী হয়ে পড়ি। আমাদের এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান চাই।
শোলাকুড়ী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মাহবুব রহমান লেবু বলেন, এটি শুধু একটি সেতু বা রাস্তার দাবি নয়; এটি হাজারো মানুষের নিরাপত্তা, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং কৃষকদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। আমরা ইতিমধ্যে মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে লিখিত আবেদন দিয়েছি। তিনি বিষয়টি দ্রুত স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন।
মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, “কাঠের সাঁকো ও কাঁচা রাস্তার বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমার দপ্তরে কোনো লিখিত আবেদন আসেনি। তবে বিষয়টি স্থানীয় মানুষের চলাচল, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও জনদুর্ভোগের সঙ্গে জড়িত। তাই গুরুত্বসহকারে বিষয়টি দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় প্রকৌশল বিভাগের সঙ্গে কথা বলে সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
এলাকাবাসীর দাবি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে দোয়ারিয়া এলাকায় একটি টেকসই পাকা সেতু নির্মাণ এবং জালাবাদা-কাটারজানী ও পোনামারী-হরিণধরা সড়ক দ্রুত পাকাকরণ করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিলে দীর্ঘদিনের এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবেন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ।











