ঢাকা ১২:৫৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাতভর সমঝোতার অভিযোগ

ধনবাড়ীতে টনসিল অপারেশনের আগেই শিশুর মৃত্যু, এনেস্থিসিয়া দেওয়ার পর মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন

ধনবাড়ী করেসপন্ডন্ট, শালবনবার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
  • আপডেট সময় : ১০:৩৫:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬ ৪২ বার পড়া হয়েছে

টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার পৌর শহরের আল মদিনা প্রাইভেট হাসপাতালে টনসিল অপারেশনের প্রস্তুতিকালে চাঁদনী (৯) নামে এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। স্বজনদের দাবি, এনেস্থিসিয়ার ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং পরে তার মৃত্যু হয়। তবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, শিশুটিকে এনেস্থিসিয়া দেওয়া হয়নি। এ ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

শুক্রবার রাত ৮টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিপরীতে অবস্থিত আল মদিনা হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। নিহত চাঁদনী ধনবাড়ী উপজেলার মুশুদ্ধি ইউনিয়নের সয়া গ্রামের আপনের মেয়ে।
নিহতের স্বজনরা জানান, ১৩ হাজার টাকার চুক্তিতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিভাগের চিকিৎসক ডা. ছাইদুর রহমানের মাধ্যমে চাঁদনীর টনসিল অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। অপারেশনের প্রস্তুতিকালে হাসপাতালের পক্ষ থেকে এনেস্থিসিয়ার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. মেহরাব হাসান শিশুটিকে অজ্ঞান করার ইনজেকশন দেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।
স্বজনদের অভিযোগ, পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে হাসপাতাল থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে অবস্থিত ধনবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে দায়িত্বরত চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে চিকিৎসক ডা. মেহরাব হাসান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শিশুটিকে কোনো এনেস্থিসিয়া দেওয়া হয়নি। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অপারেশনের প্রস্তুতির সময় সে ভয় পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কক্ষ থেকে তার দাদীকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার পর শিশুটি অজ্ঞান হয়ে যায়। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে ময়মনসিংহে পাঠানোর পথে হাজরা বাড়ি এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এমন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও নিহত শিশুর দাদীর বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাদের দাবি, এনেস্থিসিয়ার ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই চাঁদনীর অবস্থার অবনতি ঘটে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দাবির সঙ্গে তাদের বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর হাসপাতালটি বন্ধ করে মালিকপক্ষ সরে যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আল মদিনা হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. হাফিজুর রহমান প্রতি শুক্রবার সেখানে রোগী দেখেন। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, হাসপাতালের মালিক তিনি নন। অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন নাক, কান ও গলা বিভাগের চিকিৎসক ডা. ছাইদুর রহমান। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে রাতভর সালিশ ও সমঝোতার বৈঠক হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, নিহত শিশুর পরিবারসহ বিভিন্ন পক্ষকে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, প্রায় ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে নিহত শিশুর পরিবারের সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, প্রথমদিকে নিহত শিশুর বাবা ধনবাড়ী থানায় হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন বলে সাংবাদিকদের জানালেও পরে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরুস সালাম সিদ্দিক জানান, শিশু মৃত্যুর খবর তিনি জেনেছেন, তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
এ ঘটনায় অপারেশনের আগেই শিশুর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, এনেস্থিসিয়া প্রয়োগে হেরফের, চিকিৎসায় কোনো অবহেলা ছিল কি না এবং কথিত সমঝোতার অভিযোগ—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রাতভর সমঝোতার অভিযোগ

ধনবাড়ীতে টনসিল অপারেশনের আগেই শিশুর মৃত্যু, এনেস্থিসিয়া দেওয়ার পর মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন

আপডেট সময় : ১০:৩৫:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬

টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার পৌর শহরের আল মদিনা প্রাইভেট হাসপাতালে টনসিল অপারেশনের প্রস্তুতিকালে চাঁদনী (৯) নামে এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। স্বজনদের দাবি, এনেস্থিসিয়ার ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং পরে তার মৃত্যু হয়। তবে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, শিশুটিকে এনেস্থিসিয়া দেওয়া হয়নি। এ ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

শুক্রবার রাত ৮টার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিপরীতে অবস্থিত আল মদিনা হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। নিহত চাঁদনী ধনবাড়ী উপজেলার মুশুদ্ধি ইউনিয়নের সয়া গ্রামের আপনের মেয়ে।
নিহতের স্বজনরা জানান, ১৩ হাজার টাকার চুক্তিতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিভাগের চিকিৎসক ডা. ছাইদুর রহমানের মাধ্যমে চাঁদনীর টনসিল অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। অপারেশনের প্রস্তুতিকালে হাসপাতালের পক্ষ থেকে এনেস্থিসিয়ার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. মেহরাব হাসান শিশুটিকে অজ্ঞান করার ইনজেকশন দেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।
স্বজনদের অভিযোগ, পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে হাসপাতাল থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে অবস্থিত ধনবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে দায়িত্বরত চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে চিকিৎসক ডা. মেহরাব হাসান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শিশুটিকে কোনো এনেস্থিসিয়া দেওয়া হয়নি। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অপারেশনের প্রস্তুতির সময় সে ভয় পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কক্ষ থেকে তার দাদীকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার পর শিশুটি অজ্ঞান হয়ে যায়। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে ময়মনসিংহে পাঠানোর পথে হাজরা বাড়ি এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এমন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি ও নিহত শিশুর দাদীর বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তাদের দাবি, এনেস্থিসিয়ার ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই চাঁদনীর অবস্থার অবনতি ঘটে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দাবির সঙ্গে তাদের বক্তব্যের মিল পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর হাসপাতালটি বন্ধ করে মালিকপক্ষ সরে যায় বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আল মদিনা হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. হাফিজুর রহমান প্রতি শুক্রবার সেখানে রোগী দেখেন। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, হাসপাতালের মালিক তিনি নন। অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন নাক, কান ও গলা বিভাগের চিকিৎসক ডা. ছাইদুর রহমান। তবে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে রাতভর সালিশ ও সমঝোতার বৈঠক হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, নিহত শিশুর পরিবারসহ বিভিন্ন পক্ষকে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, প্রায় ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে নিহত শিশুর পরিবারের সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, প্রথমদিকে নিহত শিশুর বাবা ধনবাড়ী থানায় হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন বলে সাংবাদিকদের জানালেও পরে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরুস সালাম সিদ্দিক জানান, শিশু মৃত্যুর খবর তিনি জেনেছেন, তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
এ ঘটনায় অপারেশনের আগেই শিশুর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, এনেস্থিসিয়া প্রয়োগে হেরফের, চিকিৎসায় কোনো অবহেলা ছিল কি না এবং কথিত সমঝোতার অভিযোগ—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।