ঢাকা ০২:৩৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মীর খোরশেদ আলী ডিলার আর নেই

একাধিক পত্রিকা না পড়লে যাঁর কাছে দিনটি ছিল অর্থহীন

মধুপুর করেসপন্ডন্ট, শালবনবার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
  • আপডেট সময় : ১১:৩২:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬ ৩২ বার পড়া হয়েছে

প্রতিদিন ভোরে অপেক্ষা করতেন পত্রিকার জন্য। একাধিক দৈনিক পত্রিকা পড়া ছিল তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। দেশ-বিদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, যুদ্ধ-সংঘাত থেকে শুরু করে সমাজের নানা ঘটনা—সবকিছু নিয়েই ছিল তাঁর অদম্য কৌতূহল। পত্রিকার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খবর তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়তেন, বিশ্লেষণ করতেন এবং পরে সেগুলো নিয়েই চলত প্রাণবন্ত আলোচনা ও যুক্তিতর্ক।
টাঙ্গাইলের মধুপুর পৌর শহরের এই পত্রিকাপ্রেমী, পাঠক মীর খোরশেদ আলী ডিলার আর নেই। স্বাধীন বাংলাদেশে মধুপুরের প্রথম দিককার সরকারি সারের ডিলার ছিলেন তিনি।সেই পরিচিত পত্রিকাপ্রেমী মীর খোরশেদ আলী আর নেই। ৯৩ বছর বয়সে শনিবার দিবাগত রাত ১২টার পর, অর্থাৎ রোববারের প্রথম প্রহরে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
মধুপুর পৌর শহরের মাস্টারপাড়ায়, রাণী ভবানী সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের উত্তর পাশের বাসিন্দা মরহুম মীর মোকসেদ আলীর ছেলে তিনি।
বয়সের ভার তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ৯৩ বছর বয়সেও তিনি খালি চোখে পত্রিকা পড়তেন; কোনো চশমার প্রয়োজন হতো না। নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠের মাধ্যমে দেশের পাশাপাশি বিশ্বের নানা প্রান্তের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তিনি নিজেকে সবসময় হালনাগাদ রাখতেন। কোন দেশে কী ঘটছে, কোথায় যুদ্ধ চলছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির মোড় কোন দিকে ঘুরছে—এসব বিষয়ে তাঁর জ্ঞান অনেককেই বিস্মিত করত।
পত্রিকা থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা করতেন। রাজনৈতিক কর্মী, তরুণ কিংবা সাধারণ মানুষ—অনেকে তাঁর কাছে এসে দেশ-বিদেশের নানা বিষয়ে জানতে চাইতেন।
জীবনের এক বড় আক্ষেপ ছিল আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন। পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা কখনো তাঁর জ্ঞানপিপাসাকে থামাতে পারেনি। সংবাদপত্রকে সঙ্গী করে আত্মশিক্ষার মাধ্যমে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন একজন সচেতন, জ্ঞানসমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, শেখার ইচ্ছাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।
রোববার দুপুর ২টায় মধুপুর রাণী ভবানী সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিকেলে টেকি- নাগবাড়ী গোরস্তানের ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে ওই কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।
তাঁর মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন অসংখ্য মানুষ। অনেকেই তাঁকে মধুপুরের একজন নিবেদিত পত্রিকাপাঠক, জ্ঞানপিপাসু ও সচেতন নাগরিক হিসেবে স্মরণ করেছেন। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন তারা।
মীর খোরশেদ আলীর বিদায়ে মধুপুর হারাল এমন একজন মানুষকে, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি দূর এগোতে না পারলেও জ্ঞান অর্জনের তৃষ্ণায় ছিলেন আজীবন অদম্য। প্রতিদিনের সংবাদপত্রই ছিল তাঁর শিক্ষক, আর পাঠাভ্যাসই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মীর খোরশেদ আলী ডিলার আর নেই

একাধিক পত্রিকা না পড়লে যাঁর কাছে দিনটি ছিল অর্থহীন

আপডেট সময় : ১১:৩২:৩১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

প্রতিদিন ভোরে অপেক্ষা করতেন পত্রিকার জন্য। একাধিক দৈনিক পত্রিকা পড়া ছিল তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। দেশ-বিদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, যুদ্ধ-সংঘাত থেকে শুরু করে সমাজের নানা ঘটনা—সবকিছু নিয়েই ছিল তাঁর অদম্য কৌতূহল। পত্রিকার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খবর তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়তেন, বিশ্লেষণ করতেন এবং পরে সেগুলো নিয়েই চলত প্রাণবন্ত আলোচনা ও যুক্তিতর্ক।
টাঙ্গাইলের মধুপুর পৌর শহরের এই পত্রিকাপ্রেমী, পাঠক মীর খোরশেদ আলী ডিলার আর নেই। স্বাধীন বাংলাদেশে মধুপুরের প্রথম দিককার সরকারি সারের ডিলার ছিলেন তিনি।সেই পরিচিত পত্রিকাপ্রেমী মীর খোরশেদ আলী আর নেই। ৯৩ বছর বয়সে শনিবার দিবাগত রাত ১২টার পর, অর্থাৎ রোববারের প্রথম প্রহরে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
মধুপুর পৌর শহরের মাস্টারপাড়ায়, রাণী ভবানী সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের উত্তর পাশের বাসিন্দা মরহুম মীর মোকসেদ আলীর ছেলে তিনি।
বয়সের ভার তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ৯৩ বছর বয়সেও তিনি খালি চোখে পত্রিকা পড়তেন; কোনো চশমার প্রয়োজন হতো না। নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠের মাধ্যমে দেশের পাশাপাশি বিশ্বের নানা প্রান্তের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তিনি নিজেকে সবসময় হালনাগাদ রাখতেন। কোন দেশে কী ঘটছে, কোথায় যুদ্ধ চলছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির মোড় কোন দিকে ঘুরছে—এসব বিষয়ে তাঁর জ্ঞান অনেককেই বিস্মিত করত।
পত্রিকা থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা করতেন। রাজনৈতিক কর্মী, তরুণ কিংবা সাধারণ মানুষ—অনেকে তাঁর কাছে এসে দেশ-বিদেশের নানা বিষয়ে জানতে চাইতেন।
জীবনের এক বড় আক্ষেপ ছিল আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন। পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা কখনো তাঁর জ্ঞানপিপাসাকে থামাতে পারেনি। সংবাদপত্রকে সঙ্গী করে আত্মশিক্ষার মাধ্যমে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন একজন সচেতন, জ্ঞানসমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, শেখার ইচ্ছাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।
রোববার দুপুর ২টায় মধুপুর রাণী ভবানী সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বিকেলে টেকি- নাগবাড়ী গোরস্তানের ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে ওই কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।
তাঁর মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেছেন অসংখ্য মানুষ। অনেকেই তাঁকে মধুপুরের একজন নিবেদিত পত্রিকাপাঠক, জ্ঞানপিপাসু ও সচেতন নাগরিক হিসেবে স্মরণ করেছেন। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন তারা।
মীর খোরশেদ আলীর বিদায়ে মধুপুর হারাল এমন একজন মানুষকে, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি দূর এগোতে না পারলেও জ্ঞান অর্জনের তৃষ্ণায় ছিলেন আজীবন অদম্য। প্রতিদিনের সংবাদপত্রই ছিল তাঁর শিক্ষক, আর পাঠাভ্যাসই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।