ধনবাড়ীর পাতলাচরায় আসর
কোক স্টুডিওর পর্দার ওয়াসিমদের ধুয়া গানের পালা
- আপডেট সময় : ০৬:৩৪:৫২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ ২৫ বার পড়া হয়েছে

‘আসমানে তোর ছায়া রে কন্যা, জমিনে তোর বাড়ি…’—মাটির কাছাকাছি থাকা এক সুর।এক সময় যে কথার সুর ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহের গ্রামীণ জনপদের , সেই কথার সুর এখন কোক স্টুডিওর চিত্রায়িত বাংলার জনপ্রিয় গান। আর সেই গানের দৃশ্যায়নে দেখা গেছে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার কুমারগাতার ধুয়া গানের শিল্পী ওয়াসিমকে।
ধনবাড়ীর পাতলাচরা গ্রামে সম্প্রতি বসেছিল গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধুয়াগান। পালা করে দুইটি দল এ গানে অংশ নিয়ে ছিলেন কোক স্টুডিওর গানের শিল্পী ওয়াসিম। ‘প্রযত্ন’ নামের একটি অর্গানিক খাদ্য পণ্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত আসরের একটি দলের প্রধান ছিলেন এ অঞ্চলের গ্রামীণ ধুয়া গানের শিল্পী এই ওয়াসিম।
ধনবাড়ীন পৌর এলাকার কুমারগাতা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আহাদুল্লাহর ছেলে এই ওয়াসিম। পেশায় কখনো কাঠমিস্ত্রি, কখনো রাজমিস্ত্রি। কিন্তু নেশা তার ধুয়া গান, জারি বা পালা গানে। প্রায় ছয় বছর ধরে গান করছেন তিনি। নিজের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত তার ধুয়া, জারি পালা গান থেকেই কোক স্টুডিও বাংলার নজরে আসেন। ২০২৪ সালে আলোচিত গানটির রেকর্ডিং হয়। কর্তৃপক্ষের যোগাযোগে সেই গানের দৃশ্যায়নে ওয়াসিমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০২৫ সালের ২৩ আগস্ট গানটি প্রচারের পর তা ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপকভাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গানটি পেয়েছে বিপুল জনপ্রিয়তা। ওয়াসিমের গল্প শুধু এই ভাইরাল গানের শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প নয়। এর পেছনে আছে হারিয়ে যেতে বসা এক গ্রামীণ সাংস্কৃতিক ধারাকে ধরে রাখার চেষ্টা। গুরু ধরা এ গানের জগতে তার গুরু হলেন ওই গ্রামের আজিজুল হক। ৬০/৬৫ বয়সী আজিজুল হক মৃত আমান আলীর ছেলে । তিনি জানান, দাদা ও জেঠাদের কাছ থেকেই পেয়েছেন গান ও লোকসংস্কৃতির প্রতি টান। মাত্র ১৭-১৮ বছর বয়সে ধুয়া গান শুরু করেন তিনি। সংসারের কাজ, চাষাবাদ শেষ করে সন্ধ্যা নামলেই বসত গ্রামীণ আসর। ঘাটু গান, ধুয়া গান, লাঠিখেলা—এসবই ছিল মানুষের নির্মল বিনোদন।
আজিজুল হক বলেন, “ইতিহাস, ঘটনা আর মানুষের জীবনের কথাই ধুয়া গানের মূল বিষয়। একজন ওস্তাদ বা সর্দার সুর-ছন্দে কথাগুলো সাজান। তিনি একটি কলি ধরলে অন্যরা সমবেত কণ্ঠে সেটি তুলে নেন। এভাবেই আসর জমে ওঠে।”
ধুয়া গানের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো একটি প্রধান কলি বা পঙ্ক্তির পুনরাবৃত্তি। প্রধান শিল্পীর সঙ্গে দলীয় শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠ তৈরি করে এক ধরনের প্রশ্ন-উত্তরের আবহ। প্রেম-বিরহ, ধর্মীয় ভাবনা, কৃষিজীবন, সামাজিক অসংগতি, হাসি-ঠাট্টা, ব্যঙ্গ কিংবা মানুষের সুখ-দুঃখ—সবই উঠে আসে এসব গানে।
বয়স্ক স্থানীয়দের মতে,মধুপুর-ধনবাড়ী অঞ্চলে এই লোকগানের শিকড় বহু পুরোনো। ধনবাড়ীর যদুনাথপুর ইউনিয়নের মাহমুদপুর গ্রামের প্রয়াত সামাদ বয়াতি ছিলেন এমনই এক গ্রামীণ কবি ও বাউল শিল্পী। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার একটি বাউল গান একসময় এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। সেই গান ও পরিবেশনরীতির প্রভাবেই মাহমুদপুরে গড়ে ওঠে ধুয়া গানের অপর একটি দল। এই দলের প্রধানও কাকতালীয় একই নাম- আজিজ।
আজিজ বয়াতির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দলও এলাকায় জনপ্রিয়। মফিজ, আন্তাজ, কদ্দুস, জমির, ফজলুর হক, অসিম, আলেপসহ অনেকে এই দুই দলে গান করেন। সর্ববয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পী মফিজের বয়স ৬০।
দুই গানের দল সূত্র জানায়, মাঝখানে কিছুটা বিরতি গেলেও ২০২১-২২ সাল থেকে দল দুটি আবার নতুন করে গুছিয়ে পথ চলছে। এই পথচলায় পাশে দাঁড়িয়েছেন পাতলাচরা গ্রামের তরুণ ইকবাল হোসেন জুপিটার। আনন্দমোহন কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনায় স্নাতকোত্তর করা জুপিটার ‘প্রযত্ন’ নামে বিষমুক্ত ফল, ফসল ও কৃষিপণ্য বিপণনে কাজ করছেন। পাশাপাশি গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার কাজেও যুক্ত হয়েছেন তিনি।
প্রযত্নের সাত বছর পূর্তি ও আট বছরে পদার্পণ উপলক্ষে পাতলাচরা মোড়ে দিনব্যাপী ছিল খেলাধুলা ও বিনোদনের আয়োজন। রাতে খোলা মাঠে বসে ধুয়া ও বাউল গানের আসর। দুই দলের ধুয়া গানের প্রতিযোগিতা, পুরস্কার ও ক্রেস্ট প্রদান ছাড়াও কলাপাতায় গাঞ্জিয়া, চামারা চালের ভাত ও খিচুড়ির আয়োজন যেন ফিরিয়ে এনেছিল হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ দিনের স্মৃতি।
জুপিটার বলেন, “প্রকৃতি, পুরোনো ঐতিহ্য, চাষাবাদ ও সংস্কৃতি চর্চার এই আন্দোলন আসলে মানুষের নির্ভেজাল জীবনে ফিরে যাওয়ার আন্দোলন।”
আকাশ সংস্কৃতির দাপট আর অপসংস্কৃতির ভিড়ে গ্রামীণ জীবনের বহু শত বছরের গান, খেলা ও বিনোদনের ধরন আজ বিলুপ্তির পথে। সেই সময়ে কোক স্টুডিও বাংলার পর্দায় ওয়াসিমের মতো এক গ্রামীণ শিল্পীর উপস্থিতি যেন মনে করিয়ে দেয়—মাটির সুর কখনো হারিয়ে যায় না। তাই ওয়াসিম, আজিজ আর জুপিটারদের গ্রামীণ ঐতিহ্য রক্ষার পথ একাকার হয়ে ছুটে চলে সামনের দিকে।















