ঢাকা ১০:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘কেনজাইল চাচা’য় ঢেকে গেছে ছবুর মিয়ার আসল পরিচয়

মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, কলার মজ্জা আর কচুর লতি বিক্রিতে বৃদ্ধ দম্পতির বেঁচে থাকার গল্প

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট শালবনবার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
  • আপডেট সময় : ০৯:০২:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে

কারও কাছে তিনি ছবুর উদ্দিন, কারও কাছে ছবুর মিয়া। তবে ধনবাড়ীর রূপশান্তি এলাকার অধিকাংশ মানুষের কাছে তার পরিচয়—‘কেনজাইল চাচা’। অন্তত দুই যুগ থেকে কলাগাছের ভেতরের নরম মজ্জা, স্থানীয় ভাষায় কেনজাইল, কচুর লতি ও কচুর ডাঁটা সংগ্রহ করে বিক্রি করেই জীবন কাটিয়েছেন তিনি। বয়সের ভারে শরীর এখন নুয়ে পড়েছে, তবুও থেমে নেই তার জীবনসংগ্রাম।

৭৯ বছর বয়সী ছবুর মিয়া ও তার স্ত্রী রেজিয়া বেগমের সংসারে নেই কোনো সচ্ছলতা। তাদের দুই মেয়ে। মেয়েরা বিয়ে করে দূরে আলাদা সংসার করছেন। নিজেদেরও তেমন সামর্থ্য না থাকায় বাবা-মায়ের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে এই বৃদ্ধ দম্পতিই নিজেদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা নিজেরাই করে আসছেন।

কচুর লতি, কচুর ডাঁটা কিংবা কলাগাছের মজ্জা সংগ্রহে তাদের কোনো মূলধন লাগে না। লাগে শুধু শ্রম, সময় আর একটু শারীরিক শক্তি। আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসব সংগ্রহ করেন তারা। এরপর কখনো বাজারের কোনো কোণে, কখনো রাস্তার মোড়ে বসে বিক্রি করেন। আবার কখনো বাড়ি বাড়ি ঘুরেও ফেরি করে বিক্রি করেন ছবুর মিয়া।

রেজিয়া বেগমের চলাফেরার শক্তি কমে গেছে। তিনি স্বামীকে কলাগাছের মজ্জা সংগ্রহে যতটুকু পারেন সহযোগিতা করেন। আর ছবুর মিয়া সেই সংগ্রহ করা সামগ্রী নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বিক্রির জন্য।

স্থানীয় কয়েকজন যুবক ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক জানান, ছোটবেলা থেকেই তারা ছবুর মিয়াকে কলার মজ্জা বিক্রি করতে দেখে আসছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাকে দেখে আসায় তার প্রকৃত নাম অনেকের কাছেই অজানা হয়ে গেছে। ‘কেনজাইল চাচা’ বললেই সবাই তাকে চিনে ফেলেন।

তাদের ভাষ্য, অভাব-অনটনের এমন জীবনেও ছবুর মিয়া ভিক্ষা করতে রাজি নন। নিজের শ্রম দিয়ে উপার্জন করেই বেঁচে থাকতে চান তিনি। দিন দিন শরীর ভেঙে পড়ছে, কিন্তু মনোবল হারাননি। শরীরকে টেনে নিয়ে এখনও মজ্জা, কচুর লতি আর কচুর ডাঁটা বিক্রি করে চলেছেন।

তার কাছ থেকে অনেকেই প্রয়োজন না থাকলেও কিছু কিনে নেন। কেউ কেউ পণ্যের প্রকৃত দামের চেয়েও বেশি টাকা দেন। মূলত কেনাকাটার আড়ালে তারা বৃদ্ধ মানুষটির পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, এই বৃদ্ধ দম্পতির নিজের কোনো ঘর নেই। দান হিসেবে পাওয়া মাত্র এক শতাংশ জমিতে পলিথিন, পুরোনো কাপড়, ছন, খড়,বাঁশ ও নানা পরিত্যক্ত সামগ্রী দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ছোট্ট খুপড়ি। সেখানেই গাদাগাদি করে রাত কাটে তাদের।

বর্ষায় বৃষ্টির পানি ঠেকানো কঠিন, শীতে কনকনে ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে থাকতে হয়। আর গরমে পলিথিনের সেই ঘরটি হয়ে ওঠে অসহনীয় উত্তপ্ত। তবুও এটাই তাদের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই।

জানা গেছে, একসময় বয়স্কভাতার কার্ডে টাকা পেতেন ছবুর মিয়া। কিন্তু প্রায় দুই থেকে আড়াই বছর ধরে অজ্ঞাত কারণে সেই ভাতাও বন্ধ রয়েছে। এরপর থেকে তাদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি নানা সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় অনেক মানুষ সুবিধা পেলেও এমন অসহায় এক বৃদ্ধ দম্পতি কেন তার বাইরে থাকবেন?

ছবুর মিয়া-রেজিয়া দম্পতির জীবনের গল্প কেবল অভাবের গল্প নয়; এটি আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার এক কঠিন লড়াই। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া দুটি মানুষ এখনও কারও কাছে হাত পাততে চান না। শ্রম দিয়ে যতটুকু পারেন, সেটুকু করেই জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন।তবে দিন দিন তাদের শরীর ভেঙে যাচ্ছে। আজ তারা যেভাবে কোনোমতে জীবন কাটাচ্ছেন, আগামী দিনগুলোতে সেই সামান্য শ্রমটুকুও করার সক্ষমতা থাকবে না।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সমাজের বিত্তবান মানুষের একটু নজর, একটি নিরাপদ ঘর, নিয়মিত বয়স্কভাতা কিংবা সামান্য সহযোগিতা হয়তো এই প্রবীণ দম্পতির জীবনের শেষ দিনগুলোকে কিছুটা স্বস্তির করে দিতে পারে।

নইলে ‘কেনজাইল চাচা’ নামে পরিচিত ছবুর মিয়া ও তার স্ত্রী রেজিয়ার এই নিঃশব্দ সংগ্রামের গল্পটি হয়তো একদিন কেবল স্মৃতিই হয়ে থাকবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

‘কেনজাইল চাচা’য় ঢেকে গেছে ছবুর মিয়ার আসল পরিচয়

মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, কলার মজ্জা আর কচুর লতি বিক্রিতে বৃদ্ধ দম্পতির বেঁচে থাকার গল্প

আপডেট সময় : ০৯:০২:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

কারও কাছে তিনি ছবুর উদ্দিন, কারও কাছে ছবুর মিয়া। তবে ধনবাড়ীর রূপশান্তি এলাকার অধিকাংশ মানুষের কাছে তার পরিচয়—‘কেনজাইল চাচা’। অন্তত দুই যুগ থেকে কলাগাছের ভেতরের নরম মজ্জা, স্থানীয় ভাষায় কেনজাইল, কচুর লতি ও কচুর ডাঁটা সংগ্রহ করে বিক্রি করেই জীবন কাটিয়েছেন তিনি। বয়সের ভারে শরীর এখন নুয়ে পড়েছে, তবুও থেমে নেই তার জীবনসংগ্রাম।

৭৯ বছর বয়সী ছবুর মিয়া ও তার স্ত্রী রেজিয়া বেগমের সংসারে নেই কোনো সচ্ছলতা। তাদের দুই মেয়ে। মেয়েরা বিয়ে করে দূরে আলাদা সংসার করছেন। নিজেদেরও তেমন সামর্থ্য না থাকায় বাবা-মায়ের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে এই বৃদ্ধ দম্পতিই নিজেদের বেঁচে থাকার ব্যবস্থা নিজেরাই করে আসছেন।

কচুর লতি, কচুর ডাঁটা কিংবা কলাগাছের মজ্জা সংগ্রহে তাদের কোনো মূলধন লাগে না। লাগে শুধু শ্রম, সময় আর একটু শারীরিক শক্তি। আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসব সংগ্রহ করেন তারা। এরপর কখনো বাজারের কোনো কোণে, কখনো রাস্তার মোড়ে বসে বিক্রি করেন। আবার কখনো বাড়ি বাড়ি ঘুরেও ফেরি করে বিক্রি করেন ছবুর মিয়া।

রেজিয়া বেগমের চলাফেরার শক্তি কমে গেছে। তিনি স্বামীকে কলাগাছের মজ্জা সংগ্রহে যতটুকু পারেন সহযোগিতা করেন। আর ছবুর মিয়া সেই সংগ্রহ করা সামগ্রী নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বিক্রির জন্য।

স্থানীয় কয়েকজন যুবক ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক জানান, ছোটবেলা থেকেই তারা ছবুর মিয়াকে কলার মজ্জা বিক্রি করতে দেখে আসছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাকে দেখে আসায় তার প্রকৃত নাম অনেকের কাছেই অজানা হয়ে গেছে। ‘কেনজাইল চাচা’ বললেই সবাই তাকে চিনে ফেলেন।

তাদের ভাষ্য, অভাব-অনটনের এমন জীবনেও ছবুর মিয়া ভিক্ষা করতে রাজি নন। নিজের শ্রম দিয়ে উপার্জন করেই বেঁচে থাকতে চান তিনি। দিন দিন শরীর ভেঙে পড়ছে, কিন্তু মনোবল হারাননি। শরীরকে টেনে নিয়ে এখনও মজ্জা, কচুর লতি আর কচুর ডাঁটা বিক্রি করে চলেছেন।

তার কাছ থেকে অনেকেই প্রয়োজন না থাকলেও কিছু কিনে নেন। কেউ কেউ পণ্যের প্রকৃত দামের চেয়েও বেশি টাকা দেন। মূলত কেনাকাটার আড়ালে তারা বৃদ্ধ মানুষটির পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, এই বৃদ্ধ দম্পতির নিজের কোনো ঘর নেই। দান হিসেবে পাওয়া মাত্র এক শতাংশ জমিতে পলিথিন, পুরোনো কাপড়, ছন, খড়,বাঁশ ও নানা পরিত্যক্ত সামগ্রী দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ছোট্ট খুপড়ি। সেখানেই গাদাগাদি করে রাত কাটে তাদের।

বর্ষায় বৃষ্টির পানি ঠেকানো কঠিন, শীতে কনকনে ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে থাকতে হয়। আর গরমে পলিথিনের সেই ঘরটি হয়ে ওঠে অসহনীয় উত্তপ্ত। তবুও এটাই তাদের মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই।

জানা গেছে, একসময় বয়স্কভাতার কার্ডে টাকা পেতেন ছবুর মিয়া। কিন্তু প্রায় দুই থেকে আড়াই বছর ধরে অজ্ঞাত কারণে সেই ভাতাও বন্ধ রয়েছে। এরপর থেকে তাদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারি নানা সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় অনেক মানুষ সুবিধা পেলেও এমন অসহায় এক বৃদ্ধ দম্পতি কেন তার বাইরে থাকবেন?

ছবুর মিয়া-রেজিয়া দম্পতির জীবনের গল্প কেবল অভাবের গল্প নয়; এটি আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার এক কঠিন লড়াই। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া দুটি মানুষ এখনও কারও কাছে হাত পাততে চান না। শ্রম দিয়ে যতটুকু পারেন, সেটুকু করেই জীবন চালিয়ে যাচ্ছেন।তবে দিন দিন তাদের শরীর ভেঙে যাচ্ছে। আজ তারা যেভাবে কোনোমতে জীবন কাটাচ্ছেন, আগামী দিনগুলোতে সেই সামান্য শ্রমটুকুও করার সক্ষমতা থাকবে না।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সমাজের বিত্তবান মানুষের একটু নজর, একটি নিরাপদ ঘর, নিয়মিত বয়স্কভাতা কিংবা সামান্য সহযোগিতা হয়তো এই প্রবীণ দম্পতির জীবনের শেষ দিনগুলোকে কিছুটা স্বস্তির করে দিতে পারে।

নইলে ‘কেনজাইল চাচা’ নামে পরিচিত ছবুর মিয়া ও তার স্ত্রী রেজিয়ার এই নিঃশব্দ সংগ্রামের গল্পটি হয়তো একদিন কেবল স্মৃতিই হয়ে থাকবে।