শালবনবার্তা টিমের ভ্রমণকাহিনী : পর্ব - ৩
‘কুয়াকাটার সমুদ্র বিলাসে এক খন্ড সুন্দরবন জয়ের স্বাদ’
- আপডেট সময় : ০৮:৫৬:৫৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ ৭৯ বার পড়া হয়েছে

সাঁতার জানা মানুষ হিসেবেই নিজেকে চিনি। কিন্তু কুয়াকাটার এই যাত্রায় আমাকেও সাঁতার না জানা মানুষের মতো লাইফ জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে বোটে উঠতে হলো। শৈশবে শেখা সাঁতারের স্মৃতি এখনও আছে বটে, তবে দীর্ঘদিন পানিতে না নামলে সেই দক্ষতাও যে ভোঁতা হয়ে যেতে পারে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
কুয়াকাটা ভ্রমণের দ্বিতীয় দিনের সফর নির্ধারিত হলো পটুয়াখালীর সীমানা পার হয়ে পাশের বরগুনা জেলার সুন্দরবন অংশের টেংরাগিরির বনে যাওয়া। বোট দিয়ে যাওযার জোগাড় হলো। সকাল ৬ টায় বের হয়ে জানা গেল ১০ টার আগে বোট যাবে না। বাধ্য হয়ে সমুদ্রে নেমে জলকেলির জন্য কুয়াকাটা পাড়ে গিয়ে সেটাও হলো না। হোটেলে ফিরলাম। আবার বের হয়ে ১০ টায় ঘাটে পৌঁছি। বোট ছাড়লো।
আমতলীর তালতলী রেঞ্জের ফাতরার বনাঞ্চল ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে এ যাত্রার শুরুতেই চোখে পড়ল আলীপুর বাজার সংলগ্ন নদীতে ভাসমান তেলের পাম্প। নদীপথে চলাচলকারী নৌযানের জ্বালানি সরবরাহ হয় এখান থেকেই। ভাসমান এই স্থাপনাটি যেন নদীকেন্দ্রিক জীবনের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। বোট চলছে। বোটচালক মিরাজ মাঝপথে লাল কাঁকড়ার চরে নামার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমার প্রবল আগ্রহ থাকলেও দলের অধিকাংশ সদস্য রাজি না হওয়ায় সে ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে গেল। ঝাউবনের বালুচরে হাজারো লাল কাঁকড়ার ছুটোছুটি দেখা হলো না। বোট এগিয়ে চলল ফাতরার বনের দিকে।
অল্পবয়সী বোটচালক মিরাজের সঙ্গে গল্প করতে করতে জানা গেল তার জীবনের গল্পও। তার বাবা আবুল কাজী ২০১২-১৪ সালের দিকে এলাকায় পর্যটনকেন্দ্রিক বোট ব্যবসার পথিকৃৎ ছিলেন। সময়ের পালাবদলে রাজনৈতিক প্রভাব কমলেও বাবার সৃষ্টি ঐতিহ্যে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছে মিরাজ। লেখাপড়া না করে বাবার ব্যবসার হাল ধরেছেন তিনি। এখন প্রায় ৩০টি বোট নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি সমিতি। চট্টগ্রাম থেকে জাহাজের বিভিন্ন অংশ এনে বোটগুলোকে আধুনিক রূপ দেওয়া হয়েছে। মিরাজ যেন শুধু ব্যবসাই করছেন না, বাবার স্বপ্নটাকেও বাঁচিয়ে রেখেছেন।
টেংরাগিরির ফাতরার বন যে সুন্দরবনেরই একটি প্রান্তিক অংশ, তা জানলাম। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে যে প্রকৃতির এত বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে, তা কল্পনাও করিনি। যাত্রার শুরুতে সাহস দেখানোর চেষ্টা করলেও সমুদ্রের বিশাল ঢেউ আর তীব্র স্রোত সেই সাহস মুহূর্তেই গিলে ফেলল। বোট দুলতে দুলতে এগোচ্ছে, আর আমি মনে মনে দোয়া-দরুদ পড়ছি। এমনকি বোট ডুবে গেলে কোন দিকে সাঁতরাব, সেই হিসাবও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। তখনই উপলব্ধি করলাম, লাইফ জ্যাকেটের গুরুত্ব আসলে কতখানি।
প্রায় সোয়া ঘণ্টার রোমাঞ্চকর জলযাত্রা শেষে সমুদ্রের ঢেউ পেছনে ফেলে বোট একটি প্রশস্ত খাঁড়িতে ঢুকল। কিছুদূর এগোতেই চোখে পড়ল বন বিভাগের সাইনবোর্ড। মিরাজ বোটটি তীরে ভিড়াল।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটার আলীপুর বাজার থেকে উত্তাল জলরাশি পাড়ি দিয়ে আমরা ১১ জন যাত্রী বরগুনার তালতলী উপজেলার ফাতরার গভীর বনের মাটিতে পা রাখলাম। এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল তখন। সমুদ্রযাত্রার ভয় কেটে যাওয়ার স্বস্তি আর সুন্দরবনের একটি অংশে প্রবেশের উত্তেজনা মিলেমিশে একাকার।


















