ঢাকা ০৪:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস

মধুপুর শালবন রক্ষায় দুই সবুজযোদ্ধার নিরলস সংগ্রাম

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট শালবনবার্তাটোয়েন্টিফোরডটকম
  • আপডেট সময় : ০৭:০২:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬ ২৮৭ বার পড়া হয়েছে

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রেক্ষাপটে যখন পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্নটি বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনসহ পরিবেশ কে বাঁচিয়ে রাখতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন দুই প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ। একজন শিল্পী, অন্যজন পরিবেশকর্মী। দুজনের পথ ভিন্ন হলেও লক্ষ্য এক—মধুপুরের হারিয়ে যেতে বসা শালবনের প্রাণ ও সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের স্নাতকোত্তর তাপস বর্দ্ধন ধনবাড়ীর হাজরাবাড়ীর বর্দ্ধন পরিবারের সন্তান। শিল্পচর্চার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি তার রয়েছে গভীর ভালোবাসা। মধুপুর বনের প্রাকৃতিক বৃক্ষরাজি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাওয়া তাকে ভাবিয়ে তোলে। সেই ভাবনা থেকেই গত চার-পাঁচ বছর ধরে তিনি নিজ খরচে বিভিন্ন বনজ ও বিরল গাছের বীজ সংগ্রহ করে মধুপুর বনের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

তাপস বর্দ্ধনের বাড়িতেই রয়েছে নানা ধরনের বিরল ফুল ও ফলের গাছ। গাছের পরিচর্যায় তার দিনের অধিকাংশ সময় কাটে। তার বাড়িতে প্রতি বছর জমে রক্তকাঞ্চন ও গর্জন গাছ থেকে সংগ্রহ করা বিপুল পরিমাণ বীজ। তিনি প্রতি বছর বনের ভেতর এবং বনসংলগ্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেন এই বীজ। তার ভাষায়, “বীজগুলো আগে উঠান নোংরা করত, ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দেওয়া হতো। একসময় মনে হলো, নষ্ট না করে যদি বনে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো কিছু গাছ টিকে যাবে। সেই চিন্তা থেকেই কাজটি শুরু করি।”

প্রতি বছর প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার রক্তকাঞ্চনের বীজ টাঙ্গাইল -ময়মনসিংহ মহাসড়কের দু’ধারে এবং বনাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেন তিনি। তার বিশ্বাস, হাজারো বীজের মধ্যে যদি কিছু সংখ্যকও বেঁচে থাকে, তবে কয়েক বছরের মধ্যেই সেগুলো ফুলে-ফলে ভরে উঠবে। বসন্তে রক্তকাঞ্চনের সাদা, গোলাপি ও বেগুনি রঙের ফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়াবে না, পাখি ও কীটপতঙ্গের খাদ্য ও আশ্রয়েরও ব্যবস্থা করবে। সম্প্রতি এলাকায় দখল করা জমিতে যাওযা আসার রাস্তা করতে রাজনৈতিক চাপে একটি বাড়ির গাছ কাটার ঘটনা তাকে তীব্র যন্ত্রণা দিয়েছে।

অন্যদিকে মধুপুর উপজেলার শোলাকুড়ি গ্রামের বাসিন্দা রাতুল মুন্সি একজন পরিচিত তরুণ পরিবেশকর্মী। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রাতুল দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছেন। তিনদিন আগে ১ জুন শোলাকুড়ি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি শালবন রক্ষায় স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও সচেতন মহলকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

রাতুল মনে করেন, মানুষ প্রকৃতিকে যথাযথভাবে বুঝতে পারলে আলাদাভাবে ‘প্রকৃতিপ্রেমী’ হওয়ার প্রয়োজন নাই। তার মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পনাহীনভাবে বৃক্ষ নিধন চলছে, যা পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি।

তিনি বলেন, “শালবন নিয়ে স্থানীয় সমাজ, সুশীল সমাজ কিংবা রাজনৈতিক মহলের বড় কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়ে না। এটি আমাকে হতাশ করে। এখনো যে অংশটুকু বন টিকে আছে, সেটি রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া ও বিপন্ন স্থানীয় বৃক্ষগুলো ফিরিয়ে আনতে পারলে আবারও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে মধুপুরের বন।”

রাতুলের নেতৃত্বে ও অংশগ্রহণে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে দেশের ৬৪ জেলায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ গাছ রোপণ করা হয়েছে। ‘পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালা’ উদ্যোগে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০২০ সালে তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খাগড়াছড়ি পর্যন্ত প্রায় ১৫ দিনের পদযাত্রা করেন। এ যাত্রায় রামগড় চা বাগানেও যান তিনি। ‘বৃক্ষ পদযাত্রা-২০২০’ নামে ওই কর্মসূচিতে ২৬টি উপজেলায় পরিবেশ সচেতনতা প্রচার, লিফলেট বিতরণ এবং প্রতীকী বৃক্ষরোপণ করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রীন ক্যাম্পাস’-এর সক্রিয় কর্মী ও উপদেষ্টা সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

নিজের কাজের স্বীকৃতি প্রসঙ্গে রাতুল বলেন, “আমি আত্মতৃপ্তির জন্য কাজ করি। কোনো পুরস্কার বা স্বীকৃতির জন্য নয়। দিনশেষে চাই প্রকৃতি বেঁচে থাকুক, শালবন রক্ষা পাক, জীববৈচিত্র্য ফিরে আসুক।”

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাপস বর্দ্ধন ও রাতুল মুন্সির মতো মানুষদের উদ্যোগ নতুন করে আশার আলো দেখায়। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে এমন পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডই হতে পারে মধুপুর শালবনের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম শক্তি। প্রকৃতি রক্ষার এই নীরব যোদ্ধাদের প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, একটি বীজও কখনো কখনো একটি বন রক্ষার স্বপ্ন বুনতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস

মধুপুর শালবন রক্ষায় দুই সবুজযোদ্ধার নিরলস সংগ্রাম

আপডেট সময় : ০৭:০২:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রেক্ষাপটে যখন পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্নটি বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনসহ পরিবেশ কে বাঁচিয়ে রাখতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন দুই প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ। একজন শিল্পী, অন্যজন পরিবেশকর্মী। দুজনের পথ ভিন্ন হলেও লক্ষ্য এক—মধুপুরের হারিয়ে যেতে বসা শালবনের প্রাণ ও সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের স্নাতকোত্তর তাপস বর্দ্ধন ধনবাড়ীর হাজরাবাড়ীর বর্দ্ধন পরিবারের সন্তান। শিল্পচর্চার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি তার রয়েছে গভীর ভালোবাসা। মধুপুর বনের প্রাকৃতিক বৃক্ষরাজি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাওয়া তাকে ভাবিয়ে তোলে। সেই ভাবনা থেকেই গত চার-পাঁচ বছর ধরে তিনি নিজ খরচে বিভিন্ন বনজ ও বিরল গাছের বীজ সংগ্রহ করে মধুপুর বনের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

তাপস বর্দ্ধনের বাড়িতেই রয়েছে নানা ধরনের বিরল ফুল ও ফলের গাছ। গাছের পরিচর্যায় তার দিনের অধিকাংশ সময় কাটে। তার বাড়িতে প্রতি বছর জমে রক্তকাঞ্চন ও গর্জন গাছ থেকে সংগ্রহ করা বিপুল পরিমাণ বীজ। তিনি প্রতি বছর বনের ভেতর এবং বনসংলগ্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেন এই বীজ। তার ভাষায়, “বীজগুলো আগে উঠান নোংরা করত, ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দেওয়া হতো। একসময় মনে হলো, নষ্ট না করে যদি বনে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো কিছু গাছ টিকে যাবে। সেই চিন্তা থেকেই কাজটি শুরু করি।”

প্রতি বছর প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার রক্তকাঞ্চনের বীজ টাঙ্গাইল -ময়মনসিংহ মহাসড়কের দু’ধারে এবং বনাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেন তিনি। তার বিশ্বাস, হাজারো বীজের মধ্যে যদি কিছু সংখ্যকও বেঁচে থাকে, তবে কয়েক বছরের মধ্যেই সেগুলো ফুলে-ফলে ভরে উঠবে। বসন্তে রক্তকাঞ্চনের সাদা, গোলাপি ও বেগুনি রঙের ফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়াবে না, পাখি ও কীটপতঙ্গের খাদ্য ও আশ্রয়েরও ব্যবস্থা করবে। সম্প্রতি এলাকায় দখল করা জমিতে যাওযা আসার রাস্তা করতে রাজনৈতিক চাপে একটি বাড়ির গাছ কাটার ঘটনা তাকে তীব্র যন্ত্রণা দিয়েছে।

অন্যদিকে মধুপুর উপজেলার শোলাকুড়ি গ্রামের বাসিন্দা রাতুল মুন্সি একজন পরিচিত তরুণ পরিবেশকর্মী। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রাতুল দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করছেন। তিনদিন আগে ১ জুন শোলাকুড়ি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি শালবন রক্ষায় স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন ও সচেতন মহলকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

রাতুল মনে করেন, মানুষ প্রকৃতিকে যথাযথভাবে বুঝতে পারলে আলাদাভাবে ‘প্রকৃতিপ্রেমী’ হওয়ার প্রয়োজন নাই। তার মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পনাহীনভাবে বৃক্ষ নিধন চলছে, যা পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি।

তিনি বলেন, “শালবন নিয়ে স্থানীয় সমাজ, সুশীল সমাজ কিংবা রাজনৈতিক মহলের বড় কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়ে না। এটি আমাকে হতাশ করে। এখনো যে অংশটুকু বন টিকে আছে, সেটি রক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া ও বিপন্ন স্থানীয় বৃক্ষগুলো ফিরিয়ে আনতে পারলে আবারও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে মধুপুরের বন।”

রাতুলের নেতৃত্বে ও অংশগ্রহণে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে দেশের ৬৪ জেলায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ গাছ রোপণ করা হয়েছে। ‘পরিবেশ ও প্রকৃতির পাঠশালা’ উদ্যোগে বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০২০ সালে তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খাগড়াছড়ি পর্যন্ত প্রায় ১৫ দিনের পদযাত্রা করেন। এ যাত্রায় রামগড় চা বাগানেও যান তিনি। ‘বৃক্ষ পদযাত্রা-২০২০’ নামে ওই কর্মসূচিতে ২৬টি উপজেলায় পরিবেশ সচেতনতা প্রচার, লিফলেট বিতরণ এবং প্রতীকী বৃক্ষরোপণ করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রীন ক্যাম্পাস’-এর সক্রিয় কর্মী ও উপদেষ্টা সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

নিজের কাজের স্বীকৃতি প্রসঙ্গে রাতুল বলেন, “আমি আত্মতৃপ্তির জন্য কাজ করি। কোনো পুরস্কার বা স্বীকৃতির জন্য নয়। দিনশেষে চাই প্রকৃতি বেঁচে থাকুক, শালবন রক্ষা পাক, জীববৈচিত্র্য ফিরে আসুক।”

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাপস বর্দ্ধন ও রাতুল মুন্সির মতো মানুষদের উদ্যোগ নতুন করে আশার আলো দেখায়। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে এমন পরিবেশবান্ধব কর্মকাণ্ডই হতে পারে মধুপুর শালবনের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম শক্তি। প্রকৃতি রক্ষার এই নীরব যোদ্ধাদের প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, একটি বীজও কখনো কখনো একটি বন রক্ষার স্বপ্ন বুনতে পারে।