ঢাকা ১২:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘কাণ্ডজ্ঞানহীন সাংবাদিকতা’:  ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’

সুইডেন থেকে আনিসুর রহমান
  • আপডেট সময় : ১১:৩১:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬ ৪১ বার পড়া হয়েছে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজকারবার দেখে প্রায়ই ঘাবড়ে যাই, কখনো মনটাই খারাপ হয়ে যায়।  আজকে একটি ছবি আর ছবিকে ঘিরে প্রকাশিত একটি বক্তব্যে থমকে গেলাম।  বুঝে উঠতে পারছিলাম মানুষের চিন্তা প্রক্রিয়ায় সুস্থ আর স্বাভাবিক বোধ বিবেচনা কি উদাও হয়ে যাচ্ছে কি না। ছবিটি তুলেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন একজন সাংবাদিক। এখানে খোদ সাংবাদিকের নামটি উল্লেখ করে তাঁকে বড় বা ছোট করতে চাই না।

প্রথমেই ছবিটি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাংবাদিকের প্রকাশিত বয়ানে আলোকপাত করতে চাই।  শুরুতেই তার বয়ানটা হুবহু তুলে ধরছি:

‘মধুপুরের উপজেলার কোনো কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এইভাবে ঘুমায় . . .’

 

এবার ছবির প্রসঙ্গে আসি।  একটি বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে একজন শিক্ষিকা টেবিলে মাথা রেখে বসে আছেন। তার পাশেপাশে চেয়ারগুলো খালি, অফিস কক্ষেও কেউ নাই।  এরকম একটি ছবি কোন বিবেচনায় একজন পেশাদার সাংবাদিক প্রকাশ করতে পারে তার আমার মাথায় ঢুকে না।

পরে আমি খোঁজ নেবার চেষ্টা করি।  খোঁজ নিয়ে যতটুক জানতে পারি, ছবির এই শিক্ষিকা ক্লাস শেষে তাঁর জন্যে নির্ধারিত অফিস কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ক্লাসের সময়টুকু বাদে একজন শিক্ষক আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিদ্যালয়ের নির্ধারিত কর্মদিবসে কর্মঘণ্টার ভেতরে তিনি বিদ্যালয়ের আঙ্গিনার ভেতরে নিজের স্বাধীন মত সময় কাটাতে পারেন, বই পড়তে পারেন, পরিবেশ মত বিশ্রাম নিতে পারেন, সহকর্মী এমনকি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গল্প বা আলাপ করেও সময় কাটাতে পারেন। কিংবা সহপাঠ্যক্রমিক বিষয় নিয়েও ব্যস্ত থাকতে পারেন। এর সবকিছুই শিক্ষাকার্যক্রমের ভেতরেই পরে।  এমনকি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সহকর্মী বা দফতরকে অগগত করে একজন শিক্ষক বিদ্যালয় আঙ্গিনার বাইরেও যেতে পারেন।

সাংবাদিক মহোদয়ের উদ্দেশে একটি বিষয় সামনে আনতে চাই।  আমাদের স্কুলজীবনে পরীক্ষায় আমাদের এক বা একাধিক বিষয়ে ভাবসম্প্রসারণ করতে হতো।  ভাবসম্প্রসারণ এর জন্যে বিশ্রাম এবং কাজ নিয়েও নিম্নোক্ত বিষয়টি প্রায়শই প্রশ্নপত্রে থাকত:

বিশ্রাম কাজের অঙ্গে একসঙ্গে গাঁথা

নয়নের অঙ্গ যেমন নয়নের পাতা।

সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এই ছবি প্রসঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া কিরকম সে বিষয়টি সামনে  আনতে চাই।  ধারণা করি সাংবাদিক মহোদয় ‘ভাইরাল’ হবার খায়েশে ছবিটি তুলেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তবে আশার কথা হলো মন্তব্যকারদীদের প্রায় সকলেই সাংবাদিক মহোদয়কে বাহবা দেবার পরিবর্তে তার পেশাদারি মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এখানে মন্তব্যগুলোর কয়েকটি তুলে ধরছি:

‘অফ পিরিয়ড থাকলে তো একটু রেস্ট নিতেই পারে।’

‘ক্লাসের ফাঁকে এভাবে বিশ্রাম নিলে সমস্যা কি?

মানুষের কি ক্লান্তি আসতে পারে না?’

 

‘দুর্বল জায়গায় ক্যামেরা রেডি, যেখানে দুর্নীতির জায়গা সেখানে ব্ল্যাক কফি খেয়ে চলে আসে।’

‘কি লিখেন আপনি? একখান ছবি ফেইসবুকে মেরে দিলেই মিয়া সাংবাদিক সাজা যাবে না।  অইসব ছাড়েন। উনি অসুস্থ হতে পারেন বা ক্লাস অফ থাকতে পারে।  তাতে আপনার এত চুলকানি কিসের?’

এবার একজন নাগরিকের বা সাংবাদিকের দায়বদ্ধতা প্রসঙ্গে আসি।  একজনের যেমন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে তেমনি সেই স্বাধীনতার ভোগ করার জন্যে দায়বদ্ধতাও আছে।  এই দায়বদ্ধতা সত্যের পক্ষে, দুর্বল আর নিগৃহীত নিপীড়িতের পক্ষে। এবার আমরা যারা কলম ধরি বা ক্যামেরা চালাই তার কতটুকু দায়বদ্ধ থাকি বিবেক বিবেচনার কাছে? তার চেয়েও বড় কথা কাণ্ডজ্ঞান আর আর নাগরিকতা বোধ।

আমি আপনি চাইলেই একটি অফিস কক্ষে বা কারো বাসায় ঢুকে যেতে পারি না।  চাইলেই অনুমতি ছাড়া কারো একান্ত বা ব্যক্তিগত বা বিশ্রাম মুহূর্তের ছবি তুলে ফেলতে পারি না।  এখানে নৈতিক, পেশাদারি জবাদিহিতার পাশাপাশি আইনগত বাধ্যবাদকতাও আছে।  এর সবকিছু কাগজের বিদ্যায় কতটুকু আছে বা নাই তার চেয়ে বড় কথা কাণ্ডজ্ঞান যথাযথ ব্যবহার তো আবশ্যক সে সাংবাদিকটি হোক বা আমলাগিরিই হোক।

পুরো বিষয়টিকে ইঙ্গিত করার জন্যে বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদের শরণ নিয়ে লেখাটি শেষ করছি: ‘নেই কাজ তো খই ভাজ”। কাণ্ডজ্ঞানহীন সাংবাদিকতা কি আদতে এমনটাই?

 

 

আনিসুর রহমান,

লেখকঃ কবি ও নাট্যকার

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

‘কাণ্ডজ্ঞানহীন সাংবাদিকতা’:  ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’

আপডেট সময় : ১১:৩১:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজকারবার দেখে প্রায়ই ঘাবড়ে যাই, কখনো মনটাই খারাপ হয়ে যায়।  আজকে একটি ছবি আর ছবিকে ঘিরে প্রকাশিত একটি বক্তব্যে থমকে গেলাম।  বুঝে উঠতে পারছিলাম মানুষের চিন্তা প্রক্রিয়ায় সুস্থ আর স্বাভাবিক বোধ বিবেচনা কি উদাও হয়ে যাচ্ছে কি না। ছবিটি তুলেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন একজন সাংবাদিক। এখানে খোদ সাংবাদিকের নামটি উল্লেখ করে তাঁকে বড় বা ছোট করতে চাই না।

প্রথমেই ছবিটি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাংবাদিকের প্রকাশিত বয়ানে আলোকপাত করতে চাই।  শুরুতেই তার বয়ানটা হুবহু তুলে ধরছি:

‘মধুপুরের উপজেলার কোনো কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এইভাবে ঘুমায় . . .’

 

এবার ছবির প্রসঙ্গে আসি।  একটি বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে একজন শিক্ষিকা টেবিলে মাথা রেখে বসে আছেন। তার পাশেপাশে চেয়ারগুলো খালি, অফিস কক্ষেও কেউ নাই।  এরকম একটি ছবি কোন বিবেচনায় একজন পেশাদার সাংবাদিক প্রকাশ করতে পারে তার আমার মাথায় ঢুকে না।

পরে আমি খোঁজ নেবার চেষ্টা করি।  খোঁজ নিয়ে যতটুক জানতে পারি, ছবির এই শিক্ষিকা ক্লাস শেষে তাঁর জন্যে নির্ধারিত অফিস কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ক্লাসের সময়টুকু বাদে একজন শিক্ষক আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিদ্যালয়ের নির্ধারিত কর্মদিবসে কর্মঘণ্টার ভেতরে তিনি বিদ্যালয়ের আঙ্গিনার ভেতরে নিজের স্বাধীন মত সময় কাটাতে পারেন, বই পড়তে পারেন, পরিবেশ মত বিশ্রাম নিতে পারেন, সহকর্মী এমনকি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গল্প বা আলাপ করেও সময় কাটাতে পারেন। কিংবা সহপাঠ্যক্রমিক বিষয় নিয়েও ব্যস্ত থাকতে পারেন। এর সবকিছুই শিক্ষাকার্যক্রমের ভেতরেই পরে।  এমনকি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সহকর্মী বা দফতরকে অগগত করে একজন শিক্ষক বিদ্যালয় আঙ্গিনার বাইরেও যেতে পারেন।

সাংবাদিক মহোদয়ের উদ্দেশে একটি বিষয় সামনে আনতে চাই।  আমাদের স্কুলজীবনে পরীক্ষায় আমাদের এক বা একাধিক বিষয়ে ভাবসম্প্রসারণ করতে হতো।  ভাবসম্প্রসারণ এর জন্যে বিশ্রাম এবং কাজ নিয়েও নিম্নোক্ত বিষয়টি প্রায়শই প্রশ্নপত্রে থাকত:

বিশ্রাম কাজের অঙ্গে একসঙ্গে গাঁথা

নয়নের অঙ্গ যেমন নয়নের পাতা।

সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এই ছবি প্রসঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া কিরকম সে বিষয়টি সামনে  আনতে চাই।  ধারণা করি সাংবাদিক মহোদয় ‘ভাইরাল’ হবার খায়েশে ছবিটি তুলেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। তবে আশার কথা হলো মন্তব্যকারদীদের প্রায় সকলেই সাংবাদিক মহোদয়কে বাহবা দেবার পরিবর্তে তার পেশাদারি মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এখানে মন্তব্যগুলোর কয়েকটি তুলে ধরছি:

‘অফ পিরিয়ড থাকলে তো একটু রেস্ট নিতেই পারে।’

‘ক্লাসের ফাঁকে এভাবে বিশ্রাম নিলে সমস্যা কি?

মানুষের কি ক্লান্তি আসতে পারে না?’

 

‘দুর্বল জায়গায় ক্যামেরা রেডি, যেখানে দুর্নীতির জায়গা সেখানে ব্ল্যাক কফি খেয়ে চলে আসে।’

‘কি লিখেন আপনি? একখান ছবি ফেইসবুকে মেরে দিলেই মিয়া সাংবাদিক সাজা যাবে না।  অইসব ছাড়েন। উনি অসুস্থ হতে পারেন বা ক্লাস অফ থাকতে পারে।  তাতে আপনার এত চুলকানি কিসের?’

এবার একজন নাগরিকের বা সাংবাদিকের দায়বদ্ধতা প্রসঙ্গে আসি।  একজনের যেমন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে তেমনি সেই স্বাধীনতার ভোগ করার জন্যে দায়বদ্ধতাও আছে।  এই দায়বদ্ধতা সত্যের পক্ষে, দুর্বল আর নিগৃহীত নিপীড়িতের পক্ষে। এবার আমরা যারা কলম ধরি বা ক্যামেরা চালাই তার কতটুকু দায়বদ্ধ থাকি বিবেক বিবেচনার কাছে? তার চেয়েও বড় কথা কাণ্ডজ্ঞান আর আর নাগরিকতা বোধ।

আমি আপনি চাইলেই একটি অফিস কক্ষে বা কারো বাসায় ঢুকে যেতে পারি না।  চাইলেই অনুমতি ছাড়া কারো একান্ত বা ব্যক্তিগত বা বিশ্রাম মুহূর্তের ছবি তুলে ফেলতে পারি না।  এখানে নৈতিক, পেশাদারি জবাদিহিতার পাশাপাশি আইনগত বাধ্যবাদকতাও আছে।  এর সবকিছু কাগজের বিদ্যায় কতটুকু আছে বা নাই তার চেয়ে বড় কথা কাণ্ডজ্ঞান যথাযথ ব্যবহার তো আবশ্যক সে সাংবাদিকটি হোক বা আমলাগিরিই হোক।

পুরো বিষয়টিকে ইঙ্গিত করার জন্যে বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদের শরণ নিয়ে লেখাটি শেষ করছি: ‘নেই কাজ তো খই ভাজ”। কাণ্ডজ্ঞানহীন সাংবাদিকতা কি আদতে এমনটাই?

 

 

আনিসুর রহমান,

লেখকঃ কবি ও নাট্যকার