অসহায় নারীকে সন্তানসহ নিরাপদে বাড়ি ফেরাল ‘প্রয়াস’
- আপডেট সময় : ১০:০০:২৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে

স্বামীকে খুঁজতে দূর সুনামগঞ্জ থেকে টাঙ্গাইলের মধুপুরে এসেছিলেন লক্ষ্মী দাশ। সঙ্গে ছিল ছোট্ট শিশুসন্তান। স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে একপর্যায়ে মোবাইল ফোনটিও হারিয়ে যায়। স্বামীকে না পেয়ে, টাকা-পয়সা ও খাবারের সংকটে তিন দিন ধরে শিশুকে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত মধুপুরের তরুণ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘প্রয়াস’-এর সদস্যদের নজরে পড়েন অসহায় এই মা ও তার সন্তান। প্রশাসনের সহযোগিতায় তাদের নিরাপদে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সংগঠনটি।
রোববার (৩০ আগস্ট) সকালে উপজেলার দিকে যাওয়ার পথে মধুপুর শহরের শহীদ স্মৃতি রোডে এক নারীকে ছোট শিশুসন্তানসহ কান্নারত অবস্থায় কয়েকজন মানুষের মাঝে দেখতে পান প্রয়াসের সদস্যরা। তাকে ঘিরে থাকা লোকজন নানা প্রশ্ন করলেও আতঙ্ক ও মানসিক বিপর্যস্ততার কারণে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছিলেন না ওই নারী। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে প্রয়াস টিম তার কাছে এগিয়ে যায় এবং প্রথমে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে।
পরে কথা বলে জানা যায়, ওই নারীর নাম লক্ষ্মী দাশ। সুনামগঞ্জের শেরপুর এলাকার কাউরাত গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তার স্বামী স্বপন দাশ মধুপুরে অবস্থান করছেন জানতে পেরে তাকে খুঁজতেই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মধুপুরে এসেছিলেন লক্ষ্মী। স্বামী তাকে জানিয়েছিলেন, প্রায় ছয় লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার পর পাওনাদারদের চাপ ও ভয়ে তিনি মধুপুরে আত্মগোপন করে আছেন এবং মাছ বিক্রি করে জীবনযাপন করছেন।
কিন্তু মধুপুরে এসে স্বামীর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি লক্ষ্মী। স্বামী ফোন না ধরায় বিপাকে পড়েন তিনি। এর মধ্যে মধুপুর বাসস্ট্যান্ডে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তার মোবাইল ফোনসহ সঙ্গে থাকা কিছু জিনিসপত্র চুরি হয়ে যায়। ফলে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগের শেষ পথটুকুও বন্ধ হয়ে যায়। অশিক্ষিত হওয়ায় তিনি কারও মোবাইল নম্বরও বলতে পারছিলেন না।
এভাবে প্রায় তিন দিন ধরে ছোট শিশুকে নিয়ে মধুপুরের রাস্তায় রাস্তায় অবস্থান করছিলেন মা ও সন্তান। হাতে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না, খাবারেরও ব্যবস্থা ছিল না। কোথায় যাবেন, কীভাবে বাড়ি ফিরবেন—কোনো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না তিনি।
এ অবস্থায় প্রয়াস টিম তাৎক্ষণিকভাবে তাদের জন্য খাবার ও পানির ব্যবস্থা করে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ায় প্রথমে খাবার গ্রহণ করতে চাইছিলেন না লক্ষ্মী। পরে স্বেচ্ছাসেবীরা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে সাহস জোগালে তিনি শিশুসন্তানকে নিয়ে খাবার গ্রহণ করেন। খাবার পেয়ে প্রয়াসের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
পরে বিষয়টি মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামকে অবহিত করে প্রয়াস টিম। ইউএনও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে লক্ষ্মী ও তার সন্তানের খাবারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়াসকে আর্থিক সহায়তা দেন এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ফিরে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফেরার জন্য আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন লক্ষ্মী। পরে প্রয়াস টিম আবারও ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি তখন টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন। তিনি প্রয়াসকে লক্ষ্মী দাশ ও তার শিশুসন্তানের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেন এবং যাতায়াতের ব্যয় নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
ইউএনওর নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়াস টিম দ্রুত তাদের বাড়ি ফেরানোর উদ্যোগ নেয়। শেষ পর্যন্ত সকলের সহযোগিতায় লক্ষ্মী দাশ ও তার শিশুসন্তানের জন্য বাসযাত্রার ব্যবস্থা করা হয়। দীর্ঘ পথের কথা বিবেচনা করে তাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় খাবারও দেওয়া হয়। নিরাপদে বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়ে স্বস্তি ফিরে আসে অসহায় মা লক্ষ্মীর মুখে।
প্রয়াসের সদস্যরা জানান, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তাদের সংগঠনের মূল লক্ষ্য। শীতে অসহায় মানুষের মধ্যে গরম কাপড় বিতরণ, অসুস্থ ও পীড়িত মানুষের চিকিৎসা সহায়তা, খাদ্য সহায়তা, মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্তের ব্যবস্থা করাসহ বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে সংগঠনটি। এবার বিপদে পড়া এক মা ও তার শিশুর পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নিরাপদে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করতে পেরে তারা নিজেদেরও গর্বিত মনে করছেন।
এ ঘটনায় প্রয়াস টিমের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সেলিম তালুকদার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ (প্রশাসনিক)শাহরিয়ার রাফি এবং কার্যনির্বাহী সদস্য মোসাদ্দেক হোসেন।
লক্ষ্মী দাশ ও তার শিশুসন্তানকে নিরাপদে বাড়ি ফেরাতে সার্বিক সহযোগিতা করায় মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে প্রয়াস টিম।





















