ঢাকা ১১:৪৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধনবাড়ী উপজেলা প্রতিষ্ঠার ২০ বছর

দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা থেকে প্রশাসনিক পরিচয়, ঐতিহ্য আর সম্ভাবনার পথে

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট শালবনবার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
  • আপডেট সময় : ০১:৫৪:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬৩ বার পড়া হয়েছে

টাঙ্গাইলের পশ্চিম-উত্তর প্রান্তের ঐতিহ্যবাহী জনপদ ধনবাড়ী। ইতিহাস, শিক্ষা, সংস্কৃতি, কৃষি ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এ জনপদ একসময় ছিল মধুপুর উপজেলার অংশ। দীর্ঘদিনের দাবি, প্রচেষ্টা ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে ধনবাড়ী পৃথক উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। চলতি ২০২৬ সালে সেই প্রতিষ্ঠার দুই দশক পূর্ণ হচ্ছে। এ নিয়ে ধনবাড়ী শহরে চলছে নানা কর্মসূচি। কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকছেন বিগত ২০ বছর আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে এই উপজেলার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনে ভূমিকা রেখেছেন, বর্তমান ডাক, টেলিযোগাযোগ তথ্য ও প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন।

 

উপজেলা হওয়ার পথচলাঃ

ধনবাড়ীকে পৃথক প্রশাসনিক উপজেলা করার দাবি ছিল এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। স্থানীয়ভাবে প্রশাসনিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার প্রয়োজন থেকেই পৃথক উপজেলা প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ৬ জুন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি—নিকার-এর ৯৩তম বৈঠকে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলাকে বিভক্ত করে ধনবাড়ী নামে নতুন প্রশাসনিক উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ১১ জুলাই ২০০৬ তারিখে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নতুন উপজেলা গঠিত হয় ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে।

এরপর কিসামত ধনবাড়ী মৌজায় মধুপুর-জামালপুর মহাসড়কের পশ্চিম পাশে, ধনবাড়ী বাজার ও বাসস্ট্যান্ডের দক্ষিণ প্রান্তে নতুন প্রশাসনিক ভবনের জন্য ব্যবস্থা করা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ধনবাড়ী উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়।

 

দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার বাস্তবায়নঃ

ধনবাড়ীকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা করার পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বেরও ভূমিকা ছিল। ধনবাড়ী উপজেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, স্থানীয় উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে ধনবাড়ীকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা করার দাবি আগেই উঠেছিল। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে একই উপজেলা মধুপুরে পৌরসভা থাকার পরও ধনবাড়ী আলাদা পৌরসভা করে সরকারি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। একই সরকারি তথ্যে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৯৮ সালে ধনবাড়ীকে পুলিশী থানা প্রতিষ্ঠা এবং ২০০১ সালে উপজেলা স্থাপনের সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়।

অবশেষে ২০০৬ সালে সেই দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা বাস্তব রূপ পায়। মধুপুর উপজেলার একটি অংশ পৃথক হয়ে ধনবাড়ী স্বতন্ত্র প্রশাসনিক পরিচয় লাভ করে। ২০ বছর আগে আজকের দিনে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রধান অতিথি হিসেবে ধনবাড়ীতে এসে পৃথক উপজেলা করার রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা দেন, ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এ সময় তার পাশে ছিলেন বর্তমান ডাক, টেলিযোগাযোগ তথ্য ও প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন।

 

সাত ইউনিয়ন ও এক পৌরসভাঃ

প্রতিষ্ঠার সময় ধনবাড়ী উপজেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয় ৭টি ইউনিয়ন ও ধনবাড়ী পৌরসভাকে। ইউনিয়নগুলো হলো—বীরতারা, যদুনাথপুর, পাইস্কা, ধোপাখালী, মুশুদ্দি, বানিয়াজান ও বলিভদ্র।

প্রশাসনিক উপজেলা প্রতিষ্ঠার ফলে স্থানীয় মানুষকে বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে আগের তুলনায় কাছাকাছি প্রশাসনিক কাঠামো পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে।

 

ইতিহাসের পাতায় ধনবাড়ীঃ

উপজেলা হিসেবে বয়স দুই দশক হলেও ধনবাড়ীর ইতিহাস অনেক পুরোনো। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ধনবাড়ী নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর জন্মস্থান। শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে তার অবদান ধনবাড়ীর ঐতিহ্যকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। সরকারি উপজেলা পোর্টালের তথ্যে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একজন এবং দেশের শিক্ষা ও সামাজিক জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ধনবাড়ী নামের উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে লোককথা। জনশ্রুতি রয়েছে, ধনাই সাধুর নাম অনুসারে ধনবাড়ী নামের উৎপত্তি। আবার কৃষি উৎপাদনের কারণে এ অঞ্চল ‘শস্যভাণ্ডার’ হিসেবেও পরিচিত। এছাড়াও আছে আরো কিছু লোককথা।

 

জেলা আন্দোলনের সঙ্গেও সম্পর্কঃ

ধনবাড়ীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপজেলা প্রতিষ্ঠার অনেক আগের। টাঙ্গাইলকে পৃথক জেলা করার দাবির ইতিহাসেও ধনবাড়ীর নাম রয়েছে। নবাব স্যার নওয়াব আলী চৌধুরীর উদ্যোগে ১৯১২ সালে ধনবাড়ীতে জমিদার ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে টাঙ্গাইলকে পৃথক জেলা করার দাবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল—যা টাঙ্গাইলের প্রশাসনিক ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

 

প্রকৃতি ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যঃ

ধনবাড়ী উপজেলার পূর্বদিকে মধুপুর উপজেলা ও মধুপুর গড়, উত্তরে জামালপুর জেলা, দক্ষিণে গোপালপুর উপজেলা এবং পশ্চিমে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলা। ফলে ভৌগোলিকভাবেও ধনবাড়ী টাঙ্গাইলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী জনপদ।

মধুপুর গড়ের পশ্চিম প্রান্ত থেকে ধনবাড়ীর বিস্তৃতি। কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যও গড়ে উঠেছে। সরকারি উপজেলা তথ্যে ধনবাড়ীকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি জনপদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

দুই দশকের অর্জন, সামনে নতুন প্রত্যাশাঃ

২০০৬ সালে উপজেলা প্রতিষ্ঠার সময় যে প্রত্যাশা নিয়ে ধনবাড়ী স্বতন্ত্র প্রশাসনিক পরিচয় পেয়েছিল, দুই দশকে সেই প্রত্যাশার অনেকটাই পূরণ হয়েছে। সরকারি সেবা বিস্তারের পাশাপাশি যোগাযোগ, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এসেছে পরিবর্তন।

তবে একটি উপজেলার উন্নয়ন কেবল প্রশাসনিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। পরিকল্পিত নগরায়ণ, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষির আধুনিকায়ন, পরিবেশ ও জলাভূমি সংরক্ষণ এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষার মতো বিষয়গুলোও এখন ধনবাড়ীর ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

দুই দশকের পথচলায় ধনবাড়ী আজ আর কেবল একটি নতুন উপজেলা নয়; এটি নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনা নিয়ে টাঙ্গাইলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। ২০০৬ সালের প্রশাসনিক আত্মপ্রকাশের পর ২০ বছরে ধনবাড়ী দাঁড়িয়েছে নতুন পরিচয়ের ভিতের ওপর। এখন প্রত্যাশা—আগামী দিনের ধনবাড়ী হবে আরও পরিকল্পিত, সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ একটি উপজেলা। আজকের কর্মসূচির মধ্যদিয়ে ধনবাড়ী কে আরো সমৃদ্ধ করার শপথ নিবেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ধনবাড়ী উপজেলা প্রতিষ্ঠার ২০ বছর

দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা থেকে প্রশাসনিক পরিচয়, ঐতিহ্য আর সম্ভাবনার পথে

আপডেট সময় : ০১:৫৪:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

টাঙ্গাইলের পশ্চিম-উত্তর প্রান্তের ঐতিহ্যবাহী জনপদ ধনবাড়ী। ইতিহাস, শিক্ষা, সংস্কৃতি, কৃষি ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এ জনপদ একসময় ছিল মধুপুর উপজেলার অংশ। দীর্ঘদিনের দাবি, প্রচেষ্টা ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে ধনবাড়ী পৃথক উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। চলতি ২০২৬ সালে সেই প্রতিষ্ঠার দুই দশক পূর্ণ হচ্ছে। এ নিয়ে ধনবাড়ী শহরে চলছে নানা কর্মসূচি। কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকছেন বিগত ২০ বছর আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে এই উপজেলার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনে ভূমিকা রেখেছেন, বর্তমান ডাক, টেলিযোগাযোগ তথ্য ও প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন।

 

উপজেলা হওয়ার পথচলাঃ

ধনবাড়ীকে পৃথক প্রশাসনিক উপজেলা করার দাবি ছিল এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। স্থানীয়ভাবে প্রশাসনিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার প্রয়োজন থেকেই পৃথক উপজেলা প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ৬ জুন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি—নিকার-এর ৯৩তম বৈঠকে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলাকে বিভক্ত করে ধনবাড়ী নামে নতুন প্রশাসনিক উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ১১ জুলাই ২০০৬ তারিখে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নতুন উপজেলা গঠিত হয় ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে।

এরপর কিসামত ধনবাড়ী মৌজায় মধুপুর-জামালপুর মহাসড়কের পশ্চিম পাশে, ধনবাড়ী বাজার ও বাসস্ট্যান্ডের দক্ষিণ প্রান্তে নতুন প্রশাসনিক ভবনের জন্য ব্যবস্থা করা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ধনবাড়ী উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়।

 

দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার বাস্তবায়নঃ

ধনবাড়ীকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা করার পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বেরও ভূমিকা ছিল। ধনবাড়ী উপজেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, স্থানীয় উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে ধনবাড়ীকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা করার দাবি আগেই উঠেছিল। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে একই উপজেলা মধুপুরে পৌরসভা থাকার পরও ধনবাড়ী আলাদা পৌরসভা করে সরকারি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। একই সরকারি তথ্যে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৯৮ সালে ধনবাড়ীকে পুলিশী থানা প্রতিষ্ঠা এবং ২০০১ সালে উপজেলা স্থাপনের সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়।

অবশেষে ২০০৬ সালে সেই দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা বাস্তব রূপ পায়। মধুপুর উপজেলার একটি অংশ পৃথক হয়ে ধনবাড়ী স্বতন্ত্র প্রশাসনিক পরিচয় লাভ করে। ২০ বছর আগে আজকের দিনে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রধান অতিথি হিসেবে ধনবাড়ীতে এসে পৃথক উপজেলা করার রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা দেন, ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এ সময় তার পাশে ছিলেন বর্তমান ডাক, টেলিযোগাযোগ তথ্য ও প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন।

 

সাত ইউনিয়ন ও এক পৌরসভাঃ

প্রতিষ্ঠার সময় ধনবাড়ী উপজেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয় ৭টি ইউনিয়ন ও ধনবাড়ী পৌরসভাকে। ইউনিয়নগুলো হলো—বীরতারা, যদুনাথপুর, পাইস্কা, ধোপাখালী, মুশুদ্দি, বানিয়াজান ও বলিভদ্র।

প্রশাসনিক উপজেলা প্রতিষ্ঠার ফলে স্থানীয় মানুষকে বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে আগের তুলনায় কাছাকাছি প্রশাসনিক কাঠামো পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে।

 

ইতিহাসের পাতায় ধনবাড়ীঃ

উপজেলা হিসেবে বয়স দুই দশক হলেও ধনবাড়ীর ইতিহাস অনেক পুরোনো। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ধনবাড়ী নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর জন্মস্থান। শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে তার অবদান ধনবাড়ীর ঐতিহ্যকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। সরকারি উপজেলা পোর্টালের তথ্যে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একজন এবং দেশের শিক্ষা ও সামাজিক জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ধনবাড়ী নামের উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে লোককথা। জনশ্রুতি রয়েছে, ধনাই সাধুর নাম অনুসারে ধনবাড়ী নামের উৎপত্তি। আবার কৃষি উৎপাদনের কারণে এ অঞ্চল ‘শস্যভাণ্ডার’ হিসেবেও পরিচিত। এছাড়াও আছে আরো কিছু লোককথা।

 

জেলা আন্দোলনের সঙ্গেও সম্পর্কঃ

ধনবাড়ীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপজেলা প্রতিষ্ঠার অনেক আগের। টাঙ্গাইলকে পৃথক জেলা করার দাবির ইতিহাসেও ধনবাড়ীর নাম রয়েছে। নবাব স্যার নওয়াব আলী চৌধুরীর উদ্যোগে ১৯১২ সালে ধনবাড়ীতে জমিদার ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে টাঙ্গাইলকে পৃথক জেলা করার দাবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল—যা টাঙ্গাইলের প্রশাসনিক ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

 

প্রকৃতি ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যঃ

ধনবাড়ী উপজেলার পূর্বদিকে মধুপুর উপজেলা ও মধুপুর গড়, উত্তরে জামালপুর জেলা, দক্ষিণে গোপালপুর উপজেলা এবং পশ্চিমে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলা। ফলে ভৌগোলিকভাবেও ধনবাড়ী টাঙ্গাইলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী জনপদ।

মধুপুর গড়ের পশ্চিম প্রান্ত থেকে ধনবাড়ীর বিস্তৃতি। কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে ধানসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যও গড়ে উঠেছে। সরকারি উপজেলা তথ্যে ধনবাড়ীকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি জনপদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

দুই দশকের অর্জন, সামনে নতুন প্রত্যাশাঃ

২০০৬ সালে উপজেলা প্রতিষ্ঠার সময় যে প্রত্যাশা নিয়ে ধনবাড়ী স্বতন্ত্র প্রশাসনিক পরিচয় পেয়েছিল, দুই দশকে সেই প্রত্যাশার অনেকটাই পূরণ হয়েছে। সরকারি সেবা বিস্তারের পাশাপাশি যোগাযোগ, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এসেছে পরিবর্তন।

তবে একটি উপজেলার উন্নয়ন কেবল প্রশাসনিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। পরিকল্পিত নগরায়ণ, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষির আধুনিকায়ন, পরিবেশ ও জলাভূমি সংরক্ষণ এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষার মতো বিষয়গুলোও এখন ধনবাড়ীর ভবিষ্যৎ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

দুই দশকের পথচলায় ধনবাড়ী আজ আর কেবল একটি নতুন উপজেলা নয়; এটি নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনা নিয়ে টাঙ্গাইলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। ২০০৬ সালের প্রশাসনিক আত্মপ্রকাশের পর ২০ বছরে ধনবাড়ী দাঁড়িয়েছে নতুন পরিচয়ের ভিতের ওপর। এখন প্রত্যাশা—আগামী দিনের ধনবাড়ী হবে আরও পরিকল্পিত, সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ একটি উপজেলা। আজকের কর্মসূচির মধ্যদিয়ে ধনবাড়ী কে আরো সমৃদ্ধ করার শপথ নিবেন সংশ্লিষ্টরা।