ঢাকা ০৮:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৭ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে যা হবে

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট শালবনবার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
  • আপডেট সময় : ০৬:৩৯:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ৩১ বার পড়া হয়েছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একেবারে দরজায় কড়া নাড়ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বহুল প্রতীক্ষিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সৃষ্টি করেছে এক নতুন উত্তেজনা ও কৌতূহল। এবারের নির্বাচন শুধু সংসদে নেতৃত্ব নির্ধারণের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ— একই দিনে সংবিধান সংস্কারের জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনের বিষয়গুলো এই গণভোটে জনগণকে অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করতে হবে।

রাজনীতির অঙ্গনে এই যুগল নির্বাচন-গণভোট পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। সাধারণ ভোটের মাধ্যমে সংসদ গঠনের পাশাপাশি দেশের সংবিধানেও পরিবর্তনের দরজা খুলে যেতে পারে কিংবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে গণভোটে ‘না’ বিজয়ী হলে বর্তমান সংবিধান অক্ষত থাকলেও, ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে এতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এখনো তীব্র বিতর্ক চলমান। বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সংবিধান সংশোধনের পুরো প্রস্তাবনা সরকারি প্রচারণায় প্রকাশ করা হয়নি, ফলে ভোটারদের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পৌঁছাচ্ছে না।

রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছে। বিরোধী দলগুলো সরকারের এই উদ্যোগকে আংশিক ও অপূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গণভোট পরিচালনার চেষ্টা হিসেবে দেখছে, যা সাংবিধানিক স্বচ্ছতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তাদের দাবি। অন্যদিকে সরকার বলছে, সংবিধান সংশোধনের এই উদ্যোগ দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে জরুরি।

সর্বশেষ পরিস্থিতিতে নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নাগরিকদের কাছে এটি কেবল একটি ভোটের দিন নয়; বরং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোটের ফলাফল শুধু নির্বাচিত সরকারের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, একই সঙ্গে দেশের সংবিধান ও শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করবে।

জুলাই জাতীয় সনদের ওপর জনমত যাচাইয়ের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর, সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়। গণভোটের ব্যালটে থাকবে চারটি প্রশ্ন। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’র মাধ্যমে দিতে হবে।

এই চারটি প্রশ্ন হলো— আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?

(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

(গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছে— সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে।

(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

জুলাই সনদে যা রয়েছে— জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া প্রস্তাবের ওপর জনগণের সম্মতি আদায়ের উদ্দেশ্যে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি সম্পর্কে খসড়া সনদের ৮ ধারায় বলা হয়েছে, (১) গণভোটে উপস্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে প্রদত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট (হ্যাঁ) সূচক হলে—

ক) এই আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গাঠনিক ক্ষমতা (constituent power) প্রয়োগ করতে পারবে।

খ) উক্ত নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ একইসাথে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং এই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

গ) পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর ২৭০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে জনগণের সার্বভৌমত্ব ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে এই আদেশের তফসিল-১ বর্ণিত জুলাই সনদ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে এবং তা সম্পন্ন করার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো এই ধারার (ঙ) উপধারায় বলা হয়েছে— উল্লেখিত সময়সীমার মধ্যে কার্যসম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে সংবিধান সংস্কার বিল পরিষদ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং তা সংবিধান সংস্কার আইনরূপে কার্যকর হবে।

জুলাই সনদের তফসিল-১ এ বর্ণিত মোট ৪৮টি সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবনা:

১. সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩-এ প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’র পাশাপাশি বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

২. অনুচ্ছেদ ৬(২) এ ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি ও নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি বলে পরিচিত হবেন’ এর স্থলে ‘বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলে পরিচিত হবে’ প্রতিস্থাপিত হবে।

৩. সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বর্তমানে সংবিধান সংশোধনে শুধু দুই তৃতীয়াংশ সদস্যগণের ভোটে গৃহীত হয়। জুলাই সনদ অনুযায়ী ৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ ও নতুনভাবে গৃহীত ৫৮ (ক)(২ক)সহ (খ)(গ)(ঘ)(ঙ) অনুচ্ছেদসমূহ সংশোধনে দুই তৃতীয়াংশ ভোটে সংসদে পাশের পাশাপাশি গণভোটের প্রয়োজন হবে।

৪. বর্তমান সংবিধানে ৭ এর ক ও খ অনুযায়ী সংবিধান রহিত করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান ছিল, জুলাই সনদে সেটি নেই।

৫. ১৫০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ক্রান্তিকালীন বিধানাবলীর ৫ম তফসিলে ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ ও ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা অংশটি বিলুপ্ত হবে।

৬. সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মূলনীতি সমূহ হলো— বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে সংবিধানের মূলনীতি হবে— সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সম্প্রীতি।

৭. সংবিধানের ১৪১ (ক)(খ) ও (গ) অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ গোলযোগের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি হুমকি বা মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ শব্দ প্রতিস্থাপিত হবে। জরুরি অবস্থা জারিতে মন্ত্রীসভার অনুমোদন ও এ সংক্রান্ত অধিবেশনে বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। জরুরি অবস্থাকালীন সময়ে সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের অধিকার খর্ব করা যাবে না।

৮. সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। জুলাই সনদে সেই অনুচ্ছেদে যুক্ত হবে— সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।

৯. মৌলিক অধিকারের বর্তমান পরিধি আরও বিস্তৃত করা হবে।

১০. বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন এবং ভোট দিতে হয় প্রকাশ্যে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

১১. বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতি নিজ ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন। জুলাই সনদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।

১২. রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করতে দুই তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের ভোট প্রয়োজন হয়। জুলাই সনদে সংসদের উভয় কক্ষের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ— উভয় কক্ষের দুই তৃতীয়াংশ ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে।

১৩. আগে সরকারের অনুমোদনে যেকোনো অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারতেন রাষ্ট্রপতি। জুলাই সনদে বলা হয়েছে— শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবার সম্মতি দিলে অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।

১৪. বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদের কোনো সময়সীমা নেই। জুলাই সনদে একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে।

১৫. বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী দলীয় প্রধান থাকতে বাধা নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে একইসঙ্গে দলীয় প্রধান ও সরকারপ্রধান থাকা যাবে না।

১৬. বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই। জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান উপদেষ্টাসহ এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি দল, বিরোধীদল, দ্বিতীয় বিরোধী দলের মতামতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে।

১৭. বর্তমানে এক কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ থাকলেও জুলাই সনদে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের কথা বলা হয়েছে। যা নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) ও উচ্চকক্ষ (সিনেট) নামে পরিচিত হবে।

১৮. নিম্নকক্ষের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলসমূহের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হার অনুযায়ী ১০০ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।

১৯. উচ্চকক্ষে অনাস্থা প্রস্তাব ও অর্থ বিলে (যেমন বাজেট) পাশ হতে হবে না। অন্যান্য বিল সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান না করলে তা পাশ হয়েছে বলে গণ্য হবে। উচ্চকক্ষ থেকে একবার ফেরৎ আসা বিল দ্বিতীয়বার নিম্নকক্ষে পাশ হলে তা আবার উচ্চকক্ষে যাবে না।

২০. উচ্চকক্ষের সদস্যদের সংসদ সদস্যদের যোগ্যতা অনুযায়ী যোগ্য হতে হবে।

২১. জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন বর্তমানে পঞ্চাশের স্থলে ক্রমান্বয়ে একশ’তে উন্নীত করা হবে।

২২. সাধারণ আসনে কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেবে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়।

২৩. আইনসভার একজন ডেপুটি স্পিকার সরকার দলের বাইরে থেকে নিতে হবে।

২৪. গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হবেন বিরোধী দল থেকে।

২৫. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা নেই। জুলাই সনদে শুধু অনাস্থা প্রস্তাব ও বাজেট বাদে নিজ দলের বিপক্ষে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারবেন।

২৬. এতদিন বিদেশের সঙ্গে সরকারের কোনো চুক্তি করতে হলে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন হতো না। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে— রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো চুক্তি করতে হলে সংসদের উভয় কক্ষে তা অনুমোদন করতে হবে।

২৭. সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে এতদিন নির্বাচন কমিশনের একক কর্তৃত্ব থাকলেও গণভোটে জুলাই সনদ পাশ হলে একক কর্তৃত্ব হারাবে ইসি। তখন ইসির সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটিও এই দায়িত্ব পালন করবে।

২৮. বর্তমানে প্রধান বিচারপতি কাদের মধ্য থেকে নিয়োগ হবে তা স্পষ্ট না থাকলেও জুলাই সনদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে।

২৯. জুলাই সনদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি প্রধান বিচারপতি হবেন।

৩০. আপিল বিভাগে বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রধান বিচারপতি চাহিদামতো হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারবেন।

৩১. সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কাউন্সিল থাকবে।

৩২. সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের বিচারপতি নিয়োগে কমিশন থাকবে।

৩৩. বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।

৩৪. ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের এক বা একাধিক বেঞ্চ স্থাপন করা হবে।

৩৫. বিচারকদের অপসারণ সংক্রান্ত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের শক্তিশালীকরণ ও এখতিয়ার বৃদ্ধি করা হবে।

৩৬. অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকবে।

৩৭. সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা ইউনিটে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস চালু করা হবে।

৩৮. নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগে প্রধানমন্ত্রী, সরকারি দল ও বিরোধী দলীয় নেতাসহ ৫ সদস্যের বাছাই কমিটি সুপারিশ করবে।

৩৯. ন্যায়পাল নিয়োগে সংসদ নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতাসহ ৭ সদস্যের বাছাই কমিটি থাকবে।

৪০. পিএসসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগে সরকার দল ও বিরোধী দলে প্রতিনিধিসহ ৭ সদস্যের বাছাই কমিটি থাকবে।

৪১. মহা হিসাব নিরীক্ষক নিয়োগে সরকার দল ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিসহ ৭ সদস্যের বাছাই কমিটি থাকবে।

৪২. দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগে সরকার দলের প্রতিনিধিসহ ৭ সদস্যের বাছাই কমিটি থাকবে।

৪৩. সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সংবিধান সংশোধন করা হবে।

৪৪. স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে।

৪৫. স্থানীয় সরকার আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বাধীন হবে।

৪৬. সরকারি কর্মকর্তাদের স্থানীয় সরকারের অধীনে ন্যস্ত করা হবে।

৪৭. স্থানীয় সরকারে নিজস্ব তহবিল থাকবে।

৪৮. সংসদ, সংসদীয় কমিটি ও কমিটির সদস্যদের অধিকার ও দায় সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন করা হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত বাংলাদেশের সংবিধান বদলানোর একটি বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ। অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই জাতীয় সনদ নামে যে খসড়া প্রস্তাব করেছে, সেটির ওপর জনগণের মতামত জানতেই গণভোট আয়োজন করা হয়েছে। গণভোটে চারটি প্রশ্ন থাকবে এবং জনগণকে কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলতে হবে। এই সনদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— যদি গণভোটে জনগণ সমর্থন দেয়, তাহলে পরবর্তী সংসদ সদস্যরাই একইসঙ্গে সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তারা ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংশোধনের কাজ সম্পন্ন করবেন। এমনকি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলেও সংশোধনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস হয়ে যাবে। বিষয়টি অনেকের কাছে প্রশ্ন তৈরি করছে, কারণ এতে আলোচনা ও বিরোধিতার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।

তারা আরও বলেন, সনদে যেসব পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, তার বড় অংশই ক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না রেখে বিকেন্দ্রীকরণের প্রস্তাব। যেমন— প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর করা, একই ব্যক্তি একসঙ্গে দলীয় প্রধান ও সরকারপ্রধান না থাকা, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, সংসদকে দুই কক্ষ বিশিষ্ট করা এবং বিরোধী দলের ভূমিকা বাড়ানো। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুদক, পিএসসি ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একক ক্ষমতার বদলে সরকার ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। এতে এসব প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে স্বাধীন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

একই সঙ্গে সংবিধানের কিছু মৌলিক জায়গায় বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বদলে নাগরিক পরিচয়ের কথা বলা হয়েছে, সংবিধানের মূলনীতিতে নতুন শব্দ যোগ হচ্ছে, এমনকি ১৯৭১ সালের কিছু সাংবিধানিক উল্লেখ বাদ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। এসব বিষয় রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। সব মিলিয়ে, জুলাই জাতীয় সনদ রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম নতুনভাবে সাজানোর একটি বড় উদ্যোগ। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এতগুলো পরিবর্তন একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা বাস্তবে কতটা সম্ভব ও কার্যকর হবে— সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে যা হবে

আপডেট সময় : ০৬:৩৯:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একেবারে দরজায় কড়া নাড়ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বহুল প্রতীক্ষিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সৃষ্টি করেছে এক নতুন উত্তেজনা ও কৌতূহল। এবারের নির্বাচন শুধু সংসদে নেতৃত্ব নির্ধারণের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ— একই দিনে সংবিধান সংস্কারের জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনের বিষয়গুলো এই গণভোটে জনগণকে অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করতে হবে।

রাজনীতির অঙ্গনে এই যুগল নির্বাচন-গণভোট পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। সাধারণ ভোটের মাধ্যমে সংসদ গঠনের পাশাপাশি দেশের সংবিধানেও পরিবর্তনের দরজা খুলে যেতে পারে কিংবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে গণভোটে ‘না’ বিজয়ী হলে বর্তমান সংবিধান অক্ষত থাকলেও, ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে এতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এখনো তীব্র বিতর্ক চলমান। বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সংবিধান সংশোধনের পুরো প্রস্তাবনা সরকারি প্রচারণায় প্রকাশ করা হয়নি, ফলে ভোটারদের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পৌঁছাচ্ছে না।

রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে নিজেদের অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছে। বিরোধী দলগুলো সরকারের এই উদ্যোগকে আংশিক ও অপূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গণভোট পরিচালনার চেষ্টা হিসেবে দেখছে, যা সাংবিধানিক স্বচ্ছতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তাদের দাবি। অন্যদিকে সরকার বলছে, সংবিধান সংশোধনের এই উদ্যোগ দেশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে জরুরি।

সর্বশেষ পরিস্থিতিতে নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

নাগরিকদের কাছে এটি কেবল একটি ভোটের দিন নয়; বরং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভোটের ফলাফল শুধু নির্বাচিত সরকারের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, একই সঙ্গে দেশের সংবিধান ও শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করবে।

জুলাই জাতীয় সনদের ওপর জনমত যাচাইয়ের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর, সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়। গণভোটের ব্যালটে থাকবে চারটি প্রশ্ন। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’র মাধ্যমে দিতে হবে।

এই চারটি প্রশ্ন হলো— আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?

(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

(গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছে— সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে।

(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

জুলাই সনদে যা রয়েছে— জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া প্রস্তাবের ওপর জনগণের সম্মতি আদায়ের উদ্দেশ্যে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি সম্পর্কে খসড়া সনদের ৮ ধারায় বলা হয়েছে, (১) গণভোটে উপস্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে প্রদত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট (হ্যাঁ) সূচক হলে—

ক) এই আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গাঠনিক ক্ষমতা (constituent power) প্রয়োগ করতে পারবে।

খ) উক্ত নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ একইসাথে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং এই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

গ) পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর ২৭০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে জনগণের সার্বভৌমত্ব ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে এই আদেশের তফসিল-১ বর্ণিত জুলাই সনদ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে এবং তা সম্পন্ন করার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো এই ধারার (ঙ) উপধারায় বলা হয়েছে— উল্লেখিত সময়সীমার মধ্যে কার্যসম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে সংবিধান সংস্কার বিল পরিষদ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং তা সংবিধান সংস্কার আইনরূপে কার্যকর হবে।

জুলাই সনদের তফসিল-১ এ বর্ণিত মোট ৪৮টি সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবনা:

১. সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩-এ প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’র পাশাপাশি বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

২. অনুচ্ছেদ ৬(২) এ ‘বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি ও নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি বলে পরিচিত হবেন’ এর স্থলে ‘বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলে পরিচিত হবে’ প্রতিস্থাপিত হবে।

৩. সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বর্তমানে সংবিধান সংশোধনে শুধু দুই তৃতীয়াংশ সদস্যগণের ভোটে গৃহীত হয়। জুলাই সনদ অনুযায়ী ৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২ ও নতুনভাবে গৃহীত ৫৮ (ক)(২ক)সহ (খ)(গ)(ঘ)(ঙ) অনুচ্ছেদসমূহ সংশোধনে দুই তৃতীয়াংশ ভোটে সংসদে পাশের পাশাপাশি গণভোটের প্রয়োজন হবে।

৪. বর্তমান সংবিধানে ৭ এর ক ও খ অনুযায়ী সংবিধান রহিত করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান ছিল, জুলাই সনদে সেটি নেই।

৫. ১৫০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ক্রান্তিকালীন বিধানাবলীর ৫ম তফসিলে ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ ও ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা অংশটি বিলুপ্ত হবে।

৬. সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মূলনীতি সমূহ হলো— বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে সংবিধানের মূলনীতি হবে— সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সম্প্রীতি।

৭. সংবিধানের ১৪১ (ক)(খ) ও (গ) অনুযায়ী জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ গোলযোগের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি হুমকি বা মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ শব্দ প্রতিস্থাপিত হবে। জরুরি অবস্থা জারিতে মন্ত্রীসভার অনুমোদন ও এ সংক্রান্ত অধিবেশনে বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। জরুরি অবস্থাকালীন সময়ে সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের অধিকার খর্ব করা যাবে না।

৮. সংবিধানের ৮ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। জুলাই সনদে সেই অনুচ্ছেদে যুক্ত হবে— সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।

৯. মৌলিক অধিকারের বর্তমান পরিধি আরও বিস্তৃত করা হবে।

১০. বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন এবং ভোট দিতে হয় প্রকাশ্যে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে গোপন ব্যালটে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

১১. বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্রপতি নিজ ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন। জুলাই সনদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।

১২. রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করতে দুই তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের ভোট প্রয়োজন হয়। জুলাই সনদে সংসদের উভয় কক্ষের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ— উভয় কক্ষের দুই তৃতীয়াংশ ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে।

১৩. আগে সরকারের অনুমোদনে যেকোনো অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারতেন রাষ্ট্রপতি। জুলাই সনদে বলা হয়েছে— শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবার সম্মতি দিলে অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি।

১৪. বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদের কোনো সময়সীমা নেই। জুলাই সনদে একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে।

১৫. বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী দলীয় প্রধান থাকতে বাধা নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে একইসঙ্গে দলীয় প্রধান ও সরকারপ্রধান থাকা যাবে না।

১৬. বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই। জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান উপদেষ্টাসহ এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি দল, বিরোধীদল, দ্বিতীয় বিরোধী দলের মতামতের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে।

১৭. বর্তমানে এক কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ থাকলেও জুলাই সনদে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের কথা বলা হয়েছে। যা নিম্নকক্ষ (জাতীয় সংসদ) ও উচ্চকক্ষ (সিনেট) নামে পরিচিত হবে।

১৮. নিম্নকক্ষের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলসমূহের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হার অনুযায়ী ১০০ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।

১৯. উচ্চকক্ষে অনাস্থা প্রস্তাব ও অর্থ বিলে (যেমন বাজেট) পাশ হতে হবে না। অন্যান্য বিল সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান না করলে তা পাশ হয়েছে বলে গণ্য হবে। উচ্চকক্ষ থেকে একবার ফেরৎ আসা বিল দ্বিতীয়বার নিম্নকক্ষে পাশ হলে তা আবার উচ্চকক্ষে যাবে না।

২০. উচ্চকক্ষের সদস্যদের সংসদ সদস্যদের যোগ্যতা অনুযায়ী যোগ্য হতে হবে।

২১. জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন বর্তমানে পঞ্চাশের স্থলে ক্রমান্বয়ে একশ’তে উন্নীত করা হবে।

২২. সাধারণ আসনে কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেবে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়।

২৩. আইনসভার একজন ডেপুটি স্পিকার সরকার দলের বাইরে থেকে নিতে হবে।

২৪. গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হবেন বিরোধী দল থেকে।

২৫. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা নেই। জুলাই সনদে শুধু অনাস্থা প্রস্তাব ও বাজেট বাদে নিজ দলের বিপক্ষে সংসদ সদস্যরা ভোট দিতে পারবেন।

২৬. এতদিন বিদেশের সঙ্গে সরকারের কোনো চুক্তি করতে হলে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন হতো না। তবে জুলাই সনদে বলা হয়েছে— রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো চুক্তি করতে হলে সংসদের উভয় কক্ষে তা অনুমোদন করতে হবে।

২৭. সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে এতদিন নির্বাচন কমিশনের একক কর্তৃত্ব থাকলেও গণভোটে জুলাই সনদ পাশ হলে একক কর্তৃত্ব হারাবে ইসি। তখন ইসির সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটিও এই দায়িত্ব পালন করবে।

২৮. বর্তমানে প্রধান বিচারপতি কাদের মধ্য থেকে নিয়োগ হবে তা স্পষ্ট না থাকলেও জুলাই সনদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে।

২৯. জুলাই সনদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি প্রধান বিচারপতি হবেন।

৩০. আপিল বিভাগে বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রধান বিচারপতি চাহিদামতো হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারবেন।

৩১. সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কাউন্সিল থাকবে।

৩২. সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের বিচারপতি নিয়োগে কমিশন থাকবে।

৩৩. বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।

৩৪. ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের এক বা একাধিক বেঞ্চ স্থাপন করা হবে।

৩৫. বিচারকদের অপসারণ সংক্রান্ত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের শক্তিশালীকরণ ও এখতিয়ার বৃদ্ধি করা হবে।

৩৬. অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকবে।

৩৭. সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা ইউনিটে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস চালু করা হবে।

৩৮. নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগে প্রধানমন্ত্রী, সরকারি দল ও বিরোধী দলীয় নেতাসহ ৫ সদস্যের বাছাই কমিটি সুপারিশ করবে।

৩৯. ন্যায়পাল নিয়োগে সংসদ নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতাসহ ৭ সদস্যের বাছাই কমিটি থাকবে।

৪০. পিএসসির চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগে সরকার দল ও বিরোধী দলে প্রতিনিধিসহ ৭ সদস্যের বাছাই কমিটি থাকবে।

৪১. মহা হিসাব নিরীক্ষক নিয়োগে সরকার দল ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিসহ ৭ সদস্যের বাছাই কমিটি থাকবে।

৪২. দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগে সরকার দলের প্রতিনিধিসহ ৭ সদস্যের বাছাই কমিটি থাকবে।

৪৩. সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সংবিধান সংশোধন করা হবে।

৪৪. স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে।

৪৫. স্থানীয় সরকার আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বাধীন হবে।

৪৬. সরকারি কর্মকর্তাদের স্থানীয় সরকারের অধীনে ন্যস্ত করা হবে।

৪৭. স্থানীয় সরকারে নিজস্ব তহবিল থাকবে।

৪৮. সংসদ, সংসদীয় কমিটি ও কমিটির সদস্যদের অধিকার ও দায় সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন করা হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত বাংলাদেশের সংবিধান বদলানোর একটি বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ। অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই জাতীয় সনদ নামে যে খসড়া প্রস্তাব করেছে, সেটির ওপর জনগণের মতামত জানতেই গণভোট আয়োজন করা হয়েছে। গণভোটে চারটি প্রশ্ন থাকবে এবং জনগণকে কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলতে হবে। এই সনদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— যদি গণভোটে জনগণ সমর্থন দেয়, তাহলে পরবর্তী সংসদ সদস্যরাই একইসঙ্গে সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তারা ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংশোধনের কাজ সম্পন্ন করবেন। এমনকি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলেও সংশোধনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস হয়ে যাবে। বিষয়টি অনেকের কাছে প্রশ্ন তৈরি করছে, কারণ এতে আলোচনা ও বিরোধিতার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।

তারা আরও বলেন, সনদে যেসব পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, তার বড় অংশই ক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না রেখে বিকেন্দ্রীকরণের প্রস্তাব। যেমন— প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর করা, একই ব্যক্তি একসঙ্গে দলীয় প্রধান ও সরকারপ্রধান না থাকা, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, সংসদকে দুই কক্ষ বিশিষ্ট করা এবং বিরোধী দলের ভূমিকা বাড়ানো। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুদক, পিএসসি ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একক ক্ষমতার বদলে সরকার ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। এতে এসব প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে স্বাধীন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

একই সঙ্গে সংবিধানের কিছু মৌলিক জায়গায় বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বদলে নাগরিক পরিচয়ের কথা বলা হয়েছে, সংবিধানের মূলনীতিতে নতুন শব্দ যোগ হচ্ছে, এমনকি ১৯৭১ সালের কিছু সাংবিধানিক উল্লেখ বাদ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। এসব বিষয় রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। সব মিলিয়ে, জুলাই জাতীয় সনদ রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম নতুনভাবে সাজানোর একটি বড় উদ্যোগ। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এতগুলো পরিবর্তন একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা বাস্তবে কতটা সম্ভব ও কার্যকর হবে— সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।