ঢাকা ০৯:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শালবনবার্তা টিমের ভ্রমণকাহিনী : পর্ব–২

কুয়াকাটা সমুদ্র পাড়ের সৌন্দর্যে মিশে যাওয়া

এস. এম শহীদ, শালবনবার্তাটোয়েন্টিফোরডটকম
  • আপডেট সময় : ০৭:২৫:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬ ৮৮ বার পড়া হয়েছে

সকালের আলো ফুটতেই আমরা পৌঁছে গেলাম সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। তবে গন্তব্যে পৌঁছেই পড়তে হলো এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনায়। আগে থেকেই অনলাইনে হোটেল বুকিং দেওয়া থাকলেও সেটি পছন্দ হলো না আমাদের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ডা. রনির। ফলে শুরু হলো নতুন করে আবাসনের খোঁজ।

লেবুবাগান এলাকা থেকে সমুদ্রসৈকত ঘেঁষে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্ব দিকে একের পর এক হোটেল ঘুরে দেখলাম। কোথাও কক্ষ পছন্দ হলেও ভাড়া নাগালের বাইরে, আবার কোথাও ভাড়া মানানসই হলেও পরিবেশ মন টানল না। কোনো কোনো হোটেলের আশপাশে মাছের তীব্র গন্ধ আমাদের সরে যেতে বাধ্য করল। এদিকে দীর্ঘ পথ গাড়ি চালিয়ে আসা ডা. রনি ও হাসনাত রাব্বির চোখে তখন ঘুমের রাজ্য। মনে হচ্ছিল, রাস্তাতেই যদি একটু শুয়ে নেওয়া যেত!

রুমের খোঁজে যখন প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম, তখন আমি যুগান্তরের কুয়াকাটা প্রতিনিধি নাছির উদ্দিন বিপ্লবের সহযোগিতা চাইলাম। তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে ব্যবস্থা করেও দিলেন। কিন্তু একই সময়ে ডা. রনি ‘ব্লু ওশ্যান’ হোটেলে কক্ষ বুক করে ফেলায় বিপ্লব ভাইয়ের সহযোগিতা গ্রহণ করতে না পারার এক ধরনের বিব্রতবোধ আমাদের সঙ্গী হলো।

 

অবশেষে হোটেলে উঠেই নাস্তা সেরে গোসল করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। বিকেল চারটায় ঘুম থেকে উঠে সাড়ে চারটার দিকে বেরিয়ে পড়লাম নতুন অভিযানে। ডা. রনির সূত্রে পরিচিত ফেসবুক বন্ধু রিপন এবং স্থানীয় সরকারি কলেজের ছাত্রনেতা ইসমাইল ও নাহিদের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম আলিপুর খেয়াঘাটে। সেখানে জমে উঠল চায়ের আড্ডা, গল্প আর পরিচয়ের উষ্ণতা।

ইসমাইল ও নাহিদ আমাদের নিয়ে গেলেন সমুদ্রপাড়ে সূর্যাস্ত দেখাতে। কিন্তু প্রকৃতি সেদিন যেন একটু অভিমান করেছিল। আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনায় কাঙ্ক্ষিত সূর্যাস্ত দেখা হলো না। কয়েক মিনিটের জন্য সূর্য মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিলেও অস্ত যাওয়ার সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য অধরাই থেকে গেল।

 

তবুও সন্ধ্যাটা ছিল অপূর্ব। লেবুবাগান এলাকার সৈকতে কাটানো সময় যেন স্মৃতির পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে রইল। ছবি তোলা, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ দেখা আর প্রকৃতির বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার এক অনন্য সুযোগ মিলল।

সমুদ্রের গর্জন, ঢেউয়ের আছড়ে পড়া আর দিগন্তজোড়া জলরাশি আমাকে ভাবিয়ে তুলল—এই অসীম সৃষ্টির সামনে মানুষ কত ক্ষুদ্র! প্রকৃতির এমন মহিমা সত্যিই হৃদয়কে নাড়া দেয়। মনে হলো, ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে নিজেকে পুনরায় সঞ্জীবিত করার এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে!

 

রাতের খাবারের সন্ধানে আমরা পৌঁছালাম সমুদ্র পাড়ের বাজারে কাউসার নামের এক ভদ্রলোকের বেশ বড় দোকানে। সেখানে রুটি দিয়ে পরিবেশন করা হচ্ছিল সদ্য ভাজা লাক্ষা মাছ, আরেক প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ এবং কাঁকড়া। এমন লোভনীয় আয়োজন উপেক্ষা করা সম্ভব হলো না। জীবনে প্রথমবারের মতো এভাবে সামুদ্রিক মাছ ও কাঁকড়া খাওয়ার অভিজ্ঞতা সত্যিই ছিল ব্যতিক্রমী।

আমাদের বার্তা সম্পাদক লিটন সরকার খাওয়ার ক্ষেত্রে যথারীতি দক্ষতার পরিচয় দিলেন। ডেপুটি এডিটর আরশেদ আলম মজার ছলে বললেন, মাছের মধ্যেও যেন মুরগির স্বাদ খুঁজে পেয়েছেন তিনি। আর হাসনাত রাব্বি কাঁকড়া চেখে দেখলেও সেটি তার খুব একটা পছন্দ হলো না।

ইসমাইল ও নাহিদ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গ দিলেন। তাদের আন্তরিকতা ও ভালোবাসা আমাদের মুগ্ধ করেছে। ভোরে ব্রাজিলের খেলা দেখার আগ্রহ থাকলেও কুয়াকাটার সৌন্দর্য ঘুরে দেখানোর তাদের প্রবল ইচ্ছা আমাদেরও উৎসাহিত করল। রাত প্রায় ১১টার দিকে তারা বিদায় নিলেন। যাওয়ার আগে পরদিন সকালে নৌকায় করে বনাঞ্চলসংলগ্ন নদীপথে ভ্রমণের পরিকল্পনাও করে গেলেন।

আমরাও হোটেলে ফিরে এলাম। সামনে অপেক্ষা করছে নতুন দিনের নতুন অভিজ্ঞতা। সেই প্রত্যাশা নিয়েই পরদিনের প্রস্তুতি সেরে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

 

চলবে…

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শালবনবার্তা টিমের ভ্রমণকাহিনী : পর্ব–২

কুয়াকাটা সমুদ্র পাড়ের সৌন্দর্যে মিশে যাওয়া

আপডেট সময় : ০৭:২৫:২৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

সকালের আলো ফুটতেই আমরা পৌঁছে গেলাম সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। তবে গন্তব্যে পৌঁছেই পড়তে হলো এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনায়। আগে থেকেই অনলাইনে হোটেল বুকিং দেওয়া থাকলেও সেটি পছন্দ হলো না আমাদের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ডা. রনির। ফলে শুরু হলো নতুন করে আবাসনের খোঁজ।

লেবুবাগান এলাকা থেকে সমুদ্রসৈকত ঘেঁষে প্রায় দুই কিলোমিটার পূর্ব দিকে একের পর এক হোটেল ঘুরে দেখলাম। কোথাও কক্ষ পছন্দ হলেও ভাড়া নাগালের বাইরে, আবার কোথাও ভাড়া মানানসই হলেও পরিবেশ মন টানল না। কোনো কোনো হোটেলের আশপাশে মাছের তীব্র গন্ধ আমাদের সরে যেতে বাধ্য করল। এদিকে দীর্ঘ পথ গাড়ি চালিয়ে আসা ডা. রনি ও হাসনাত রাব্বির চোখে তখন ঘুমের রাজ্য। মনে হচ্ছিল, রাস্তাতেই যদি একটু শুয়ে নেওয়া যেত!

রুমের খোঁজে যখন প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম, তখন আমি যুগান্তরের কুয়াকাটা প্রতিনিধি নাছির উদ্দিন বিপ্লবের সহযোগিতা চাইলাম। তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে ব্যবস্থা করেও দিলেন। কিন্তু একই সময়ে ডা. রনি ‘ব্লু ওশ্যান’ হোটেলে কক্ষ বুক করে ফেলায় বিপ্লব ভাইয়ের সহযোগিতা গ্রহণ করতে না পারার এক ধরনের বিব্রতবোধ আমাদের সঙ্গী হলো।

 

অবশেষে হোটেলে উঠেই নাস্তা সেরে গোসল করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। বিকেল চারটায় ঘুম থেকে উঠে সাড়ে চারটার দিকে বেরিয়ে পড়লাম নতুন অভিযানে। ডা. রনির সূত্রে পরিচিত ফেসবুক বন্ধু রিপন এবং স্থানীয় সরকারি কলেজের ছাত্রনেতা ইসমাইল ও নাহিদের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম আলিপুর খেয়াঘাটে। সেখানে জমে উঠল চায়ের আড্ডা, গল্প আর পরিচয়ের উষ্ণতা।

ইসমাইল ও নাহিদ আমাদের নিয়ে গেলেন সমুদ্রপাড়ে সূর্যাস্ত দেখাতে। কিন্তু প্রকৃতি সেদিন যেন একটু অভিমান করেছিল। আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনায় কাঙ্ক্ষিত সূর্যাস্ত দেখা হলো না। কয়েক মিনিটের জন্য সূর্য মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিলেও অস্ত যাওয়ার সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য অধরাই থেকে গেল।

 

তবুও সন্ধ্যাটা ছিল অপূর্ব। লেবুবাগান এলাকার সৈকতে কাটানো সময় যেন স্মৃতির পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে রইল। ছবি তোলা, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ দেখা আর প্রকৃতির বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার এক অনন্য সুযোগ মিলল।

সমুদ্রের গর্জন, ঢেউয়ের আছড়ে পড়া আর দিগন্তজোড়া জলরাশি আমাকে ভাবিয়ে তুলল—এই অসীম সৃষ্টির সামনে মানুষ কত ক্ষুদ্র! প্রকৃতির এমন মহিমা সত্যিই হৃদয়কে নাড়া দেয়। মনে হলো, ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে নিজেকে পুনরায় সঞ্জীবিত করার এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী হতে পারে!

 

রাতের খাবারের সন্ধানে আমরা পৌঁছালাম সমুদ্র পাড়ের বাজারে কাউসার নামের এক ভদ্রলোকের বেশ বড় দোকানে। সেখানে রুটি দিয়ে পরিবেশন করা হচ্ছিল সদ্য ভাজা লাক্ষা মাছ, আরেক প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ এবং কাঁকড়া। এমন লোভনীয় আয়োজন উপেক্ষা করা সম্ভব হলো না। জীবনে প্রথমবারের মতো এভাবে সামুদ্রিক মাছ ও কাঁকড়া খাওয়ার অভিজ্ঞতা সত্যিই ছিল ব্যতিক্রমী।

আমাদের বার্তা সম্পাদক লিটন সরকার খাওয়ার ক্ষেত্রে যথারীতি দক্ষতার পরিচয় দিলেন। ডেপুটি এডিটর আরশেদ আলম মজার ছলে বললেন, মাছের মধ্যেও যেন মুরগির স্বাদ খুঁজে পেয়েছেন তিনি। আর হাসনাত রাব্বি কাঁকড়া চেখে দেখলেও সেটি তার খুব একটা পছন্দ হলো না।

ইসমাইল ও নাহিদ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গ দিলেন। তাদের আন্তরিকতা ও ভালোবাসা আমাদের মুগ্ধ করেছে। ভোরে ব্রাজিলের খেলা দেখার আগ্রহ থাকলেও কুয়াকাটার সৌন্দর্য ঘুরে দেখানোর তাদের প্রবল ইচ্ছা আমাদেরও উৎসাহিত করল। রাত প্রায় ১১টার দিকে তারা বিদায় নিলেন। যাওয়ার আগে পরদিন সকালে নৌকায় করে বনাঞ্চলসংলগ্ন নদীপথে ভ্রমণের পরিকল্পনাও করে গেলেন।

আমরাও হোটেলে ফিরে এলাম। সামনে অপেক্ষা করছে নতুন দিনের নতুন অভিজ্ঞতা। সেই প্রত্যাশা নিয়েই পরদিনের প্রস্তুতি সেরে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

 

চলবে…