শালবনবার্তা টিমের ভ্রমণকাহিনী : শেষ পর্ব
অতৃপ্তি রয়ে গেল, তবুও কুয়াকাটা ভ্রমণের বিশেষত্ব বিশাল
- আপডেট সময় : ০৯:৫৫:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ ৭৯ বার পড়া হয়েছে

আমাদের শালবনবার্তা টিমের পাঁচ সদস্যের সঙ্গে ছিলেন ভোলা ও ফরিদপুরের আরও কয়েকজন ভ্রমণপিপাসু। বন বিভাগের কর্মচারী পারভেজ সাহেব, যিনি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের মানুষ, আমাদের পথ দেখিয়ে দিলেন।
বনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের ঢেউ কীভাবে গাছপালার মাঝে এসে আছড়ে পড়ে, সেই দৃশ্য দেখতে রওনা হলাম। কিছুদূর যেতেই জুতা খুলতে হলো। কাদা, শ্বাসমূল, পিচ্ছিল পথ—সবকিছু মিলিয়ে পথচলাটা ছিল কষ্টকর, কিন্তু রোমাঞ্চে ভরপুর।

কাদা মাড়িয়ে, হাতে জুতা নিয়ে কিংবা বগলে চেপে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল আমরা যেন কোনো অভিযাত্রী দলের সদস্য। চারপাশে শ্বাসমূলী গাছ, অচেনা ফুল, ছোট ছোট মাছ, রঙিন কাঁকড়া, নাম না জানা পোকামাকড়—প্রকৃতি যেন তার অগণিত রূপ মেলে ধরেছিল আমাদের সামনে।
সমুদ্রতীরে পৌঁছে শুরু হলো আনন্দের আরেক অধ্যায়। ঢেউয়ের জলে পা ডোবানো, গাছের উন্মুক্ত শেকড়ে বসে ছবি তোলা, রঙিন কাঁকড়ার ছুটোছুটি দেখা, অচেনা ফুল ছুঁয়ে দেখা—সব মিলিয়ে মুহূর্তগুলো হয়ে উঠেছিল স্মরণীয়।
কিন্তু সময় তো কারও জন্য অপেক্ষা করে না। ঘড়ির কাঁটা দুপুর ১২টা স্পর্শ করতেই ফিরে আসার প্রস্তুতি নিতে হলো। মন চাইছিল আরও কিছুক্ষণ থাকতে, কিন্তু বাস্তবতার কাছে ইচ্ছার পরাজয় ঘটল।
ফেরার পথে বন বিভাগের ছোট্ট আবাসনের পাশে পুকুরে পা ধুয়ে কিছুটা স্বস্তি মিলল। টিউবওয়েলের পানি পান করার চেষ্টা করেও লবণাক্ততায় শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে উঠল না। বিদায়ের আগে পারভেজ সাহেবের সঙ্গে আবারও কিছুক্ষণ গল্প হলো। সাহসী না হলে এমন নির্জন, ঢেউ-স্রোতবেষ্টিত এলাকায় দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়—এ কথা সহজেই বুঝে নেওয়া যায়। মধুপুরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে আমরা বিদায় নিলাম।

দুপুর ১২টা ২৮ মিনিটে বোট ছাড়ল। মনে সাহসও কিছুটা বেড়েছে। ভাবছিলাম, এবার যেহেতু স্রোতের অনুকূলে ফিরছি, তাই হয়তো বোটের দুলুনি কম হবে। বাস্তবে তেমন হয়নি, তবে ভয় অনেকটাই কেটে গিয়েছিল। তাই ফেরার যাত্রা ছিল অনেক বেশি স্বস্তির।
ফেরার পথে ঝাউবন আর লাল কাঁকড়ার চর আবারও হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। কিন্তু ক্লান্তি আর সময়ের সীমাবদ্ধতায় সেদিকে যাওয়া হলো না। বাতাসে দুলতে থাকা ঝাউগাছগুলো যেন বিদায় জানিয়ে বলছিল—”আবার এসো বন্ধু।”
পথের দুই ধারে চিংড়ির পোনা ধরা আর জেলেদের মাছ শিকারের দৃশ্যও ভীষণ উপভোগ করেছি। কুয়াকাটা ভ্রমণ করতে এসে বরগুনাও ঘোরা হয়ে গেল। সুন্দরবনের একটি অংশ দেখার অভিজ্ঞতা যত ছোটই হোক, অনুভূতিটা ছিল বিশাল।
দুপুর ১টা ৪১ মিনিটে ঘাটে ফিরলাম। তখন মনে হলো, কুয়াকাটার সমুদ্রে নেমে জলকেলি করার দীর্ঘদিনের ইচ্ছাটি হয়তো এবারও অপূর্ণই রয়ে গেল। কিন্তু জীবনের সঙ্গে এর অদ্ভুত মিল খুঁজে পেলাম। মানুষের সব আকাঙ্ক্ষা তো পূরণ হয় না। কিছু অপূর্ণতা থেকেই যায়, আর সেই অপূর্ণতাই আবার নতুন স্বপ্ন দেখায়।
আমাদের কুয়াকাটা ভ্রমণও তেমনই। কয়েকটি অপূর্ণ ইচ্ছা ভবিষ্যতে আবার ফিরে আসার কারণ হয়ে থাকবে। অতৃপ্তিটুকু তাই আক্ষেপ নয়, বরং নতুন যাত্রার প্রেরণা।
হোটেলে ফিরে গোসল, দুপুরের খাবার আর সামান্য বিশ্রাম শেষে বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে মধুপুরের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ডা. রনি ও রাব্বির দক্ষ চালনায় গাড়ি ছুটে চলল বিরামহীনভাবে। মাঝেমধ্যে টোল প্লাজা আর চায়ের বিরতি ছাড়া তেমন কোনো থামা ছিল না। ফেরার পথে মাওয়া এলাকায় ইলিশ ভাজি দিয়ে রাতের খাবারও স্মৃতির খাতায় যুক্ত হলো।
প্রায় ১২ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা শেষে আবারও মধুপুরের মাটিতে পা রাখলাম।
অতৃপ্তি ছিল, কিন্তু সেই অতৃপ্তিই ভ্রমণটিকে আরও অর্থবহ করেছে। কারণ সব পাওয়া হয়ে গেলে হয়তো আবার ফেরার আকাঙ্ক্ষা থাকত না। কুয়াকাটা আমাদের দিয়েছে সমুদ্রের বিশালতা, সুন্দরবনের স্পর্শ, প্রকৃতির রোমাঞ্চ আর মানুষের আন্তরিকতা।
এই ভ্রমণকে স্মরণীয় করে তুলতে যাঁরা পাশে ছিলেন, তাঁদের প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিশেষ করে ছাত্রনেতা ঈসমাইল, নাহিদ, ডা. রনির বন্ধু রিপন এবং আলীপুর বাজারের তাঁর সহকর্মীদের কথা ভ্রমণস্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে। কৃতজ্ঞতা শালবনবার্তাটোয়েন্টিফোর.কম টিমের প্রতিটি সদস্যের প্রতিও। আরশেদের সার্বক্ষণিক ব্যবস্থাপনা, লিটনের সহযোগিতা এবং হাসনাত রাব্বি শরীফের উপস্থিতি এই ভ্রমণকে পূর্ণতা দিয়েছে।
প্রকৃতির কাছে ঋণী হয়ে, মানুষের ভালোবাসা সঙ্গে নিয়ে, অপূর্ণতার মাঝেই নতুন যাত্রার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে শেষ হলো আমাদের কুয়াকাটা অভিযান। তবে গল্পের শেষ এখানেই নয়—কারণ সমুদ্রের ডাক কখনো শেষ হয় না।

















