মধুপুরে জব্দ ৩৯৫ বস্তা সার ‘তুমি কার?’
কালোবাজারির উদ্দেশ্যে পাচারের অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০৮:৪৪:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪০ বার পড়া হয়েছে

টাঙ্গাইলের মধুপুরে পাচারের সময় জব্দ করা ৩৯৫ বস্তা সরকারি সারের মালিকানা নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য। ঘটনার ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও কেউ সারগুলোর মালিকানা স্বীকার করছেন না। অথচ জব্দের পরপরই ট্রাক ও সার ছাড়িয়ে নিতে নানা তৎপরতা চালানোর অভিযোগ উঠেছিল। এখন সেই চিত্র পুরোপুরি উল্টো। ফলে স্থানীয়দের প্রশ্ন—‘সার তুমি কার?’
পুলিশের জব্দ তালিকা অনুযায়ী, ৩৯৫ বস্তার মধ্যে ১২৭ বস্তা টিএসপি এবং ২৬৮ বস্তা এমওপি সার রয়েছে। সরকারি হিসাবে এসব সারের মূল্য প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৪৫০ টাকা। নির্ধারিত গন্তব্যে না নিয়ে অধিক মূল্যে বিক্রির উদ্দেশ্যে একটি চক্র এসব সার মধুপুরে নিয়ে আসছিল বলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ।
এ ঘটনায় ট্রাকচালক মো. ফরহাদ হোসেন মিঠু (২৮)কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলায় নামীয় তিন আসামি হলেন—মো. রুবেল, মুক্তাগাছার পোড়াবাড়ী এলাকার মেসার্স মেজবাহ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. মোয়াজ্জেম হোসেন (৫৫) এবং রাজাবাড়ী এলাকার মেসার্স মা-বাবা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আসাদুজ্জামান খোকন (৪২)। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৪/৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। নামীয় আসামিদের সবাই পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়কের মধুপুর থানাধীন জলছত্র এলাকার ‘দিবারাত্রী হোটেল’-এর সামনে সারবোঝাই একটি ট্রাক স্থানীয় লোকজন সন্দেহজনকভাবে আটক করেন। খবর পেয়ে অরণখোলা পুলিশ ফাঁড়ির এসআই বিমল চন্দ্র পাইন নেতৃত্বাধীন পুলিশ দল রাত আনুমানিক ১টা ৫ মিনিটে ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রাকটি জব্দ করে।
জব্দ তালিকায় ১২৭ বস্তা টিএসপি সারের মূল্য ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৫০ টাকা এবং ২৬৮ বস্তা এমওপি সারের মূল্য ২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। সারবোঝাই হলুদ-নীল রঙের ট্রাকের পাশাপাশি একটি ট্রান্সপোর্ট মেমো এবং মুক্তাগাছা উপজেলার দুই ডিলারের প্রতিষ্ঠানের নামে বিএডিসির চারটি সার সরবরাহ আদেশের কপিও জব্দ করা হয়।
গ্রেপ্তার ট্রাকচালক ফরহাদ হোসেন মিঠু পাবনা জেলার আটঘড়িয়া থানার খিদিরপুর গ্রামের মো. সিরাজদৌলার ছেলে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুলিশকে জানান, ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ বিএডিসি সার ডিপো থেকে মুক্তাগাছার মেসার্স মেজবাহ এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স মা-বাবা এন্টারপ্রাইজের নামে সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
তবে বিএডিসির ময়মনসিংহ আঞ্চলিক কার্যালয় বলছে ভিন্ন কথা। আঞ্চলিক যুগ্ম পরিচালক (সার) রিয়াজুল ইসলাম টুটুল জানান, মুক্তাগাছার ওই দুই প্রতিষ্ঠানের নামে দেখানো চারটি সরবরাহ আদেশ ভুয়া। সংশ্লিষ্ট তারিখে মুক্তাগাছার ওই দুই প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দুই ডিলারের নামে সার সরবরাহ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় তদন্ত করে ওই দুই প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দের সার সংরক্ষিত অবস্থায় পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, “জব্দ করা সার এখানকার নয়। এর মালিক অন্য কেউ।” মালিক পাওয়া না গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে সরকারি মূল্যে কৃষকদের কাছে সার বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলেও জানান তিনি। তিনি মধুপুরে বিএডিসিতে চাকরিকালীন ২০২২/২৩ সালের দিকে মধুপুরে এমন একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করেন।
এদিকে মধুপুরের পিরোজপুর বাজারের রাকিব এন্টারপ্রাইজের নামও তদন্তে এসেছে। কৃষি বিভাগ থেকে এই বিক্রি পয়েন্টে যাওয়ার কথা জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র। বিশ্বস্ত একটি সূত্রের দাবি, জব্দ সার ওই প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল। ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির মালিক আব্দুর রহিম সারগুলো ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে তিনি সারটির মালিকানা অস্বীকার করছেন।
আব্দুর রহিমের সঙ্গে দুই দিন মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা যায়নি। শনিবার সন্ধ্যায় পিরোজপুর বাজারে গিয়ে রাকিব এন্টারপ্রাইজের বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা জানান, ঘটনার পর থেকে আব্দুর রহিমের বিক্রি কেন্দ্র বন্ধ থাকছে। তার ছেলে রাকিব দাবি করেন, তার বাবা এ সারকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন।
পুলিশ জানায়, সার জব্দের পর বিষয়টি মুক্তাগাছা ও ময়মনসিংহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাসহ বিএডিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানো হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনার কারণে মামলা করতে কিছুটা বিলম্ব হয়।
এ ঘটনায় অরণখোলা পুলিশ ফাঁড়ির এসআই বিমল চন্দ্র পাইন বাদী হয়ে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(১) ও ২৫(ঘ) ধারায় মধুপুর থানায় মামলা করেন। মামলার এজাহারে মুক্তাগাছার সংশ্লিষ্টরা জব্দ সারের দায় স্বীকার করেননি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার পর তদন্তে নেমে পুলিশ ময়মনসিংহের বিএডিসি আঞ্চলিক গুদাম, সদর ও মুক্তাগাছার সংশ্লিষ্ট ডিলার এবং মধুপুরের ঘটনাস্থলসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছে। তবে এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার ট্রাকচালক ছাড়া আর কাউকে আটক করা যায়নি।
মধুপুর থানার ওসি একেএম ফজলুল হক জানান, গ্রেপ্তার আসামিকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওসি (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সার মধুপুরের কোথাও নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ এর মালিকানা দাবি করেননি।” জব্দ সার নিলামের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে সরকারি সার নিয়ে এমন ঘটনায় মধুপুরের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন সার ডিলার। তাদের মতে, সরকারি বরাদ্দের সার নির্ধারিত গন্তব্যের বাইরে চলে গেলে একদিকে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, অন্যদিকে বাজারে কৃত্রিম সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়।
তদন্তে শেষ পর্যন্ত ৩৯৫ বস্তা সারের প্রকৃত মালিকানা কার নামে উঠে আসে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। আপাতত জব্দ সার পড়ে আছে পুলিশের হেফাজতে—আর ঘুরছে একটাই প্রশ্ন, ‘সার তুমি কার?’
















