ঢাকা ০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

আজ পহেলা বৈশাখ, মধুপুর হানাদার প্রতিরোধের প্রথম দিন

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট শালবনবার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
  • আপডেট সময় : ১২:৩৭:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

কেটে যাচ্ছে ৫৪ বছর| ৫৩টি এপ্রিল শেষে আবারও সেই ১৪ এপ্রিল এসেছে| যেদিন টাঙ্গাইলের মধুপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা-জনতা স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর মাত্র বিশ দিনের মাথায় থমকে দিয়েছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর চলার পথকে, মধুপুরের প্রবেশ পথকে করেছিল রুদ্ধ | আজ সেই প্রথম প্রতিরোধের দিন, ১৪ এপ্রিল ১লা বৈশাখ। বৈশাখীর নানা আয়োজনে মধুপুর জন্য এই দিনটির ঐতিহাসিক মূল্য আরও বৃদ্ধি করে |
২৫ মার্চ, ১৯৭১ ভয়াল কালরাত। বাঙালি জাতি হায়েনার আক্রমণে বিমর্ষ-বিমূঢ় হলেও প্রতিরোধে পিছু পা হয়নি। সারা দেশে গড়ে উঠে ছিল খন্ড খন্ড প্রতিরোধ। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ জয়দেবপুরের প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। সেই প্রতিরোধের ধারাবাহিকতার খন্ড চিত্র মধুপুরের প্রথম হানাদার প্রতিরোধ যুদ্ধ। দেশের পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে এবং দেশে একটি যুদ্ধ হবে একথা অনুধাবন করতে পেরেই মধুপুরের কতিপয় যুবক মার্চের ১ম সপ্তাহ থেকে সংঘঠিত হতে থাকেন। তরুণদের নিয়ে পুন্ডুরা নিবাসী আনসার সদস্য বেলায়েত মন্ডল শুরু করেন মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং। তৎকালনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য এম মনছুর আলীর নেত্বত্বে ওই প্রশিক্ষণ অনেকটা পূর্ণতা পায়। তাঁদের নেতৃত্বে প্রথমে মধুপুরের মদনগোপাল আঙ্গিনা মাঠে পরে পর্যায়ক্রমে থানার ডাকবাংলোর যতসামান্য মাঠে,সিও অফিসের দক্ষিণপার্শ্বস্থ খোলা মাঠে এবং টেংরী গোরস্থানের দক্ষিণ-পশ্চিম পার্শ্বে গজারি বাগানে চলে প্রশিক্ষণ | তৎকালীন থানার ওসি আব্দুল মালেকের(চলচ্চিত্র নায়ক সোহেল রানার পিতা) গোপনীয় সহায়তায় প্রতিদিন ভোর রাতে থানার অস্ত্রের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ চলতো। মুক্তিযোদ্ধাগণের কাছ থেকে জানা গেছে এমন তথ্য। তারা জানান,- এক পর্যায়ে প্রশিক্ষণার্থী যুবকরা থানা থেকে সকল রাইফেল ছিনিয়েও নেন।

১৩ এপ্রিল মঙ্গলবার হানাদার বাহিনী মধুপুর প্রবেশ করে।সেই দিন মধুপুরবাসীর পক্ষ থেকে কোন প্রকার প্রতিরোধ গড়ে না তুললেও পরের দিন ১৪এপ্রিল তার ভয়াবহ পরিণিতি ঘটে। ১৩ এপ্রিল হাটের দিন থাকার কারণে মুক্তিফৌজ হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কোন প্রকার প্রতিরোধ গড়ে তুলেননি অসংখ্য প্রাণহানীর ভয়ে।মুক্তিযোদ্ধাগণ জানান, ১৪ এপ্রিল বুধবার দ্বিপ্রহরের দিকে হানাদার বাহিনীর ৩টি গাড়ি রেকি করে মধুপুরের দিকে কিছু সৈন্য এবং অস্ত্রসহ চলে আসে। এর মধ্য একটি গাড়ি সরাসরি মধুপুরের বাসস্ট্যান্ডে প্রবেশ করে এবং কোন বাধার সম্মুখীন না হয়ে আবার পিছনের দিকে গিয়ে অন্যান্য গাড়ির সাথে মধুপুর প্রবেশ করার উদ্যোগ নেয়। ব্রীজের দক্ষিণ পাড়ে মালাউড়িতে মনছুর আলী ,আ.রাজ্জাক, আ.মজিদ, হাবিবুর রহমান,গোলাম মোস্তফা ও সাইদুর রহমানসহ আশপাশের উপজেলার বেশ কয়েকজন মুক্তিফৌজ গোরস্থান এলাকা থেকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পজিশন নিয়ে বসে থাকেন। মালাউড়ি জামে মসজিদের একটু দক্ষিণে রাস্তার পশ্চিমের বাঁশ ঝাড়ের আড়ালে ওঁৎ পেতে বসে থাকা মুক্তিযোদ্ধাগণ জনৈক অফিসারের গাড়ির চাকাকে লক্ষ করে গুলি ছুঁড়লে গাড়ির চাকা বিকল হয়ে যায়। গাড়ির চাকা ব্রাস্ট হয়েছে কিনা বুঝে উঠার আগেই গাড়িকে লক্ষ করে আবারও গুলি ছুঁড়ে মুক্তিযোদ্ধাগণ। মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, গুলি লাগে বেলুচি রেজিমেন্টের এক মেজরের গায়ে। অফিসার সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মুক্তিযোদ্ধাদের এলোপাথাড়ি গুলিতে হতচকিত হয়ে পড়েন তারা। শুরু হয় মধুপুরের ইতিহাসের সেই স্মরণীয় যুদ্ধ| দফায় দফায় পাকিস্তানী সেনারা পিছু হটতে শুরু করেন। মালাউড়ি গোরস্থানের ভিতর দিয়ে পাহাড়ের পাদ দেশ হয়ে আস্তে আস্তে দক্ষিণ দিকে সরে গিয়ে বর্তমান টেংরীর সি.এন্ড.বি মোড়ের অফিস এলাকা হয়ে পশ্চিম দিকে চলে যান এবং রাস্তার পার্শ্ববর্তী বাড়ি ঘরে অগ্নি সংযোগ চালাতে থাকেন। এ যুদ্ধ কয়েক ঘন্টা স্থায়ী হয়। যুদ্ধে বিকল একটি গাড়ি ও বেশ কিছু অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়। ওই যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মালাউড়ির বেসামরিক(সাধারণ মানুষ) কলিম উদ্দিন মুন্সি ও হোসেন আলী স্থানীয় মসজিদ এলাকায়, ওমর আলী ব্যাসস্ট্যান্ড এলাকায়, কাজী মোন্তাজ আলী ও টেংরী নিবাসী ইয়াকুব আলী টেংরী পাহাড়ের পাদদেশে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। এই দিনটি সারাদেশের মানুষের সাথে মধুপুরের মানুষও পহেলা বৈশাখী আমেজে পালন করেন। কিন্তু মধুপুরবাসীর নিকট দিনটি বিশেষ মর্যাদার। তাদের কাছে এটি অন্যন্য ও স্মরণীয় দিন। অনেকে সংশ্লিষ্টদের কাছ দাবি করেেছন, আগামী প্রজন্মের কাছে মধুপুরের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার,স্মৃতিময় করে রাখার কোনো উদ্যোগ। এমন প্রত্যাশা পূরণ হোক। ইতিহাসের গতি ধারায় যুক্ত হোক দিনটি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আজ পহেলা বৈশাখ, মধুপুর হানাদার প্রতিরোধের প্রথম দিন

আপডেট সময় : ১২:৩৭:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

কেটে যাচ্ছে ৫৪ বছর| ৫৩টি এপ্রিল শেষে আবারও সেই ১৪ এপ্রিল এসেছে| যেদিন টাঙ্গাইলের মধুপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা-জনতা স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর মাত্র বিশ দিনের মাথায় থমকে দিয়েছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর চলার পথকে, মধুপুরের প্রবেশ পথকে করেছিল রুদ্ধ | আজ সেই প্রথম প্রতিরোধের দিন, ১৪ এপ্রিল ১লা বৈশাখ। বৈশাখীর নানা আয়োজনে মধুপুর জন্য এই দিনটির ঐতিহাসিক মূল্য আরও বৃদ্ধি করে |
২৫ মার্চ, ১৯৭১ ভয়াল কালরাত। বাঙালি জাতি হায়েনার আক্রমণে বিমর্ষ-বিমূঢ় হলেও প্রতিরোধে পিছু পা হয়নি। সারা দেশে গড়ে উঠে ছিল খন্ড খন্ড প্রতিরোধ। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ জয়দেবপুরের প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। সেই প্রতিরোধের ধারাবাহিকতার খন্ড চিত্র মধুপুরের প্রথম হানাদার প্রতিরোধ যুদ্ধ। দেশের পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে এবং দেশে একটি যুদ্ধ হবে একথা অনুধাবন করতে পেরেই মধুপুরের কতিপয় যুবক মার্চের ১ম সপ্তাহ থেকে সংঘঠিত হতে থাকেন। তরুণদের নিয়ে পুন্ডুরা নিবাসী আনসার সদস্য বেলায়েত মন্ডল শুরু করেন মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং। তৎকালনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য এম মনছুর আলীর নেত্বত্বে ওই প্রশিক্ষণ অনেকটা পূর্ণতা পায়। তাঁদের নেতৃত্বে প্রথমে মধুপুরের মদনগোপাল আঙ্গিনা মাঠে পরে পর্যায়ক্রমে থানার ডাকবাংলোর যতসামান্য মাঠে,সিও অফিসের দক্ষিণপার্শ্বস্থ খোলা মাঠে এবং টেংরী গোরস্থানের দক্ষিণ-পশ্চিম পার্শ্বে গজারি বাগানে চলে প্রশিক্ষণ | তৎকালীন থানার ওসি আব্দুল মালেকের(চলচ্চিত্র নায়ক সোহেল রানার পিতা) গোপনীয় সহায়তায় প্রতিদিন ভোর রাতে থানার অস্ত্রের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ চলতো। মুক্তিযোদ্ধাগণের কাছ থেকে জানা গেছে এমন তথ্য। তারা জানান,- এক পর্যায়ে প্রশিক্ষণার্থী যুবকরা থানা থেকে সকল রাইফেল ছিনিয়েও নেন।

১৩ এপ্রিল মঙ্গলবার হানাদার বাহিনী মধুপুর প্রবেশ করে।সেই দিন মধুপুরবাসীর পক্ষ থেকে কোন প্রকার প্রতিরোধ গড়ে না তুললেও পরের দিন ১৪এপ্রিল তার ভয়াবহ পরিণিতি ঘটে। ১৩ এপ্রিল হাটের দিন থাকার কারণে মুক্তিফৌজ হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে কোন প্রকার প্রতিরোধ গড়ে তুলেননি অসংখ্য প্রাণহানীর ভয়ে।মুক্তিযোদ্ধাগণ জানান, ১৪ এপ্রিল বুধবার দ্বিপ্রহরের দিকে হানাদার বাহিনীর ৩টি গাড়ি রেকি করে মধুপুরের দিকে কিছু সৈন্য এবং অস্ত্রসহ চলে আসে। এর মধ্য একটি গাড়ি সরাসরি মধুপুরের বাসস্ট্যান্ডে প্রবেশ করে এবং কোন বাধার সম্মুখীন না হয়ে আবার পিছনের দিকে গিয়ে অন্যান্য গাড়ির সাথে মধুপুর প্রবেশ করার উদ্যোগ নেয়। ব্রীজের দক্ষিণ পাড়ে মালাউড়িতে মনছুর আলী ,আ.রাজ্জাক, আ.মজিদ, হাবিবুর রহমান,গোলাম মোস্তফা ও সাইদুর রহমানসহ আশপাশের উপজেলার বেশ কয়েকজন মুক্তিফৌজ গোরস্থান এলাকা থেকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পজিশন নিয়ে বসে থাকেন। মালাউড়ি জামে মসজিদের একটু দক্ষিণে রাস্তার পশ্চিমের বাঁশ ঝাড়ের আড়ালে ওঁৎ পেতে বসে থাকা মুক্তিযোদ্ধাগণ জনৈক অফিসারের গাড়ির চাকাকে লক্ষ করে গুলি ছুঁড়লে গাড়ির চাকা বিকল হয়ে যায়। গাড়ির চাকা ব্রাস্ট হয়েছে কিনা বুঝে উঠার আগেই গাড়িকে লক্ষ করে আবারও গুলি ছুঁড়ে মুক্তিযোদ্ধাগণ। মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, গুলি লাগে বেলুচি রেজিমেন্টের এক মেজরের গায়ে। অফিসার সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মুক্তিযোদ্ধাদের এলোপাথাড়ি গুলিতে হতচকিত হয়ে পড়েন তারা। শুরু হয় মধুপুরের ইতিহাসের সেই স্মরণীয় যুদ্ধ| দফায় দফায় পাকিস্তানী সেনারা পিছু হটতে শুরু করেন। মালাউড়ি গোরস্থানের ভিতর দিয়ে পাহাড়ের পাদ দেশ হয়ে আস্তে আস্তে দক্ষিণ দিকে সরে গিয়ে বর্তমান টেংরীর সি.এন্ড.বি মোড়ের অফিস এলাকা হয়ে পশ্চিম দিকে চলে যান এবং রাস্তার পার্শ্ববর্তী বাড়ি ঘরে অগ্নি সংযোগ চালাতে থাকেন। এ যুদ্ধ কয়েক ঘন্টা স্থায়ী হয়। যুদ্ধে বিকল একটি গাড়ি ও বেশ কিছু অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়। ওই যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মালাউড়ির বেসামরিক(সাধারণ মানুষ) কলিম উদ্দিন মুন্সি ও হোসেন আলী স্থানীয় মসজিদ এলাকায়, ওমর আলী ব্যাসস্ট্যান্ড এলাকায়, কাজী মোন্তাজ আলী ও টেংরী নিবাসী ইয়াকুব আলী টেংরী পাহাড়ের পাদদেশে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। এই দিনটি সারাদেশের মানুষের সাথে মধুপুরের মানুষও পহেলা বৈশাখী আমেজে পালন করেন। কিন্তু মধুপুরবাসীর নিকট দিনটি বিশেষ মর্যাদার। তাদের কাছে এটি অন্যন্য ও স্মরণীয় দিন। অনেকে সংশ্লিষ্টদের কাছ দাবি করেেছন, আগামী প্রজন্মের কাছে মধুপুরের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার,স্মৃতিময় করে রাখার কোনো উদ্যোগ। এমন প্রত্যাশা পূরণ হোক। ইতিহাসের গতি ধারায় যুক্ত হোক দিনটি।