ঢাকা ০৩:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তলিয়ে গেছে ফসল, দুশ্চিন্তায় সুনামগঞ্জের লাখো কৃষক

সুনামগঞ্জ করেসপন্ডন্ট, শালবনবার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
  • আপডেট সময় : ১২:৩৭:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে

জমি থেকে ধান তোলা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সুনামগঞ্জের ১০ লাখ কৃষক। কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল, বজ্রপাত, শ্রমিক সংকট, জ্বালানি সংকটসহ নানা সমস্যায় লাখো কৃষকের চোখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তার ছায়া।

গত দুই দিন ধরে সুনামগঞ্জে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল সকাল ৯টা পর্যন্ত) ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। একইসঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি নামছে সুনামগঞ্জের হাওর ও নদীগুলোতে। এতে সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ৩৫ সেন্টিমিটার।

মঙ্গলবার সকালে বিপৎসীমার ২ দশমিক ১৯ মিটার (৭.১৮ ফুট) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে নদীর পানি। সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধে পানি চাপ বাড়ছে। এতে সকালে মধ্যনগর উপজেলার এরনবিল হাওরের বাঁধ পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ভেঙে গেছে। মুহূর্তের মধ্যেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে কয়েকশত একর জমির আধাপাকা ও পাকা ধান। কৃষকরা যখন কাস্তে হাতে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই প্রকৃতির এমন আচরণে ম্লান হয়ে গেছে হাওরের ধান গোলায় তোলার সব আনন্দ। অনেক কৃষককে দেখা গেছে, কোমরসমান পানিতে নেমে আধপাকা ধান কেটে শেষ সম্বলটুকু রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করতে।​

​শুধু হাওরেই নয়, জলাবদ্ধতা হানা দিয়েছে কৃষকের আঙিনাতেও। শাল্লা উপজেলায় সোমবার কৃষকরা যে ধান রোদে শুকানোর জন্য খলায় দিয়েছিলেন, ভারী বৃষ্টিতে সেই খলাগুলো এখন ছোটখাটো জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। গতকালের শুকনো ধান আজ পানির নিচে। সারা বছরের আহার চোখের সামনে পচে যাচ্ছে আর কৃষক যুদ্ধ করছেন সে ফসল রক্ষায়।

দিরাই উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নের কিত্তারগাঁও গ্রামের কৃষক গোপাল তালুকদার বলেন, বন্যার আগেই বৃষ্টি পানিতে পাগনার হাওরে আমার ৭ কিয়ার (৭ বিঘা) জমির ধান তলিয়ে গেছে। কিছু ধান হয়তো কাটা যাবে কিন্তু শুকাবো কই। সব জায়গাইতো ভেজা। ধান কেটে কি করবো।

শাল্লা উপজেলার হাবিবপুর গ্রামের কৃষাণী রাণী দাস বলেন, গতকালকেও এখানে ধান শুকানো হয়েছে। কিন্তু আজকে দের হাত পানির নিছে আমার পাকা ধান। বাড়ির সবাই মিলে ধান তুলতেছি, কিন্তু বৃষ্টি থামতেছে না। শুকানোর জায়গা নাই, সবকিছু পানিতে ভাসতেছে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হালুয়ারগাঁও গ্রামের কৃষক সিদ্দিকুর রহমান সুমন বলেন, শিয়ালমারা হাওরে আমার চার বিঘা জমির মাঝে তিন বিঘাই পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষি অফিস বলে দ্রুত ধান কাটার কথা। কিন্তু শ্রমিক নাই, মেশিন নাই ধান কেমনে কাটমু। দুই দিন যাবত বৃষ্টি হচ্ছে। শ্রমিক বজ্রপাতের ভয়ে আসতে চায় না।

জেলা কৃষি বিভাগের দাবি, সোমবার জেলার হাওরে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমির মধ্যে ৯২ হাজার ৮৮৭ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, যা ৫৬.২০১ ভাগ। নন হাওরে উঁচু এলাকায় ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমির মধ্যে ৬ হাজার ৫৯৬ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, যা ১১.৩২৭ ভাগ। গড়ে জেলায় ধান কাটা হয়েছে ৪৪.৫০৯ ভাগ।

শিলাবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় প্রথম তিন ধাপে হাওরে ২০৪৭ হেক্টর জমি, নতুন করে বৃষ্টিপাতের কারণে আরও ১২০৭ হেক্টরসহ মোট ৩ হাজার ২৫৮ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে জেলা কৃষি বিভাগের এই ক্ষয়-ক্ষতির তথ্য মানতে নারাজ স্থানীয় কৃষক ও হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের দায়িত্বশীলরা। তাদের দাবি গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারী বৃষ্টি হওয়ায় প্রতিদিনই ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান বাড়ছে।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন ঢাকা পোস্টকে বলেন, হাওরে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে জেলার হাওরের পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সঠিক তথ্য প্রকাশ করেন না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষাবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা। শ্রমিকদের পাশপাশি জেলায় ধান কাটার যন্ত্র ৬০২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ১৪৬টি রিপার রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জে হাওরের বোরো ফসলরক্ষায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার মাটির ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করেছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আগাম বন্যার আশঙ্কা আছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক ঢাকা পোস্টকে বলেন, যে জমিতে ধান ৮০ ভাগ পাকা রয়েছে সেগুলো দ্রুত কাটার জন্য কৃষকদের অনুরোধ করছি। কৃষকরা দিনে-রাতে কাজ করে হাওর থেকে ধান তোলার চেষ্টা করছেন। এখন প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে, ক্ষয়-ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

তলিয়ে গেছে ফসল, দুশ্চিন্তায় সুনামগঞ্জের লাখো কৃষক

আপডেট সময় : ১২:৩৭:০২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬

জমি থেকে ধান তোলা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সুনামগঞ্জের ১০ লাখ কৃষক। কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল, বজ্রপাত, শ্রমিক সংকট, জ্বালানি সংকটসহ নানা সমস্যায় লাখো কৃষকের চোখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তার ছায়া।

গত দুই দিন ধরে সুনামগঞ্জে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় (মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল সকাল ৯টা পর্যন্ত) ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। একইসঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি নামছে সুনামগঞ্জের হাওর ও নদীগুলোতে। এতে সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বেড়েছে ৩৫ সেন্টিমিটার।

মঙ্গলবার সকালে বিপৎসীমার ২ দশমিক ১৯ মিটার (৭.১৮ ফুট) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে নদীর পানি। সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধে পানি চাপ বাড়ছে। এতে সকালে মধ্যনগর উপজেলার এরনবিল হাওরের বাঁধ পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ভেঙে গেছে। মুহূর্তের মধ্যেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে কয়েকশত একর জমির আধাপাকা ও পাকা ধান। কৃষকরা যখন কাস্তে হাতে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই প্রকৃতির এমন আচরণে ম্লান হয়ে গেছে হাওরের ধান গোলায় তোলার সব আনন্দ। অনেক কৃষককে দেখা গেছে, কোমরসমান পানিতে নেমে আধপাকা ধান কেটে শেষ সম্বলটুকু রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করতে।​

​শুধু হাওরেই নয়, জলাবদ্ধতা হানা দিয়েছে কৃষকের আঙিনাতেও। শাল্লা উপজেলায় সোমবার কৃষকরা যে ধান রোদে শুকানোর জন্য খলায় দিয়েছিলেন, ভারী বৃষ্টিতে সেই খলাগুলো এখন ছোটখাটো জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। গতকালের শুকনো ধান আজ পানির নিচে। সারা বছরের আহার চোখের সামনে পচে যাচ্ছে আর কৃষক যুদ্ধ করছেন সে ফসল রক্ষায়।

দিরাই উপজেলার রফিনগর ইউনিয়নের কিত্তারগাঁও গ্রামের কৃষক গোপাল তালুকদার বলেন, বন্যার আগেই বৃষ্টি পানিতে পাগনার হাওরে আমার ৭ কিয়ার (৭ বিঘা) জমির ধান তলিয়ে গেছে। কিছু ধান হয়তো কাটা যাবে কিন্তু শুকাবো কই। সব জায়গাইতো ভেজা। ধান কেটে কি করবো।

শাল্লা উপজেলার হাবিবপুর গ্রামের কৃষাণী রাণী দাস বলেন, গতকালকেও এখানে ধান শুকানো হয়েছে। কিন্তু আজকে দের হাত পানির নিছে আমার পাকা ধান। বাড়ির সবাই মিলে ধান তুলতেছি, কিন্তু বৃষ্টি থামতেছে না। শুকানোর জায়গা নাই, সবকিছু পানিতে ভাসতেছে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হালুয়ারগাঁও গ্রামের কৃষক সিদ্দিকুর রহমান সুমন বলেন, শিয়ালমারা হাওরে আমার চার বিঘা জমির মাঝে তিন বিঘাই পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষি অফিস বলে দ্রুত ধান কাটার কথা। কিন্তু শ্রমিক নাই, মেশিন নাই ধান কেমনে কাটমু। দুই দিন যাবত বৃষ্টি হচ্ছে। শ্রমিক বজ্রপাতের ভয়ে আসতে চায় না।

জেলা কৃষি বিভাগের দাবি, সোমবার জেলার হাওরে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমির মধ্যে ৯২ হাজার ৮৮৭ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, যা ৫৬.২০১ ভাগ। নন হাওরে উঁচু এলাকায় ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমির মধ্যে ৬ হাজার ৫৯৬ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে, যা ১১.৩২৭ ভাগ। গড়ে জেলায় ধান কাটা হয়েছে ৪৪.৫০৯ ভাগ।

শিলাবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় প্রথম তিন ধাপে হাওরে ২০৪৭ হেক্টর জমি, নতুন করে বৃষ্টিপাতের কারণে আরও ১২০৭ হেক্টরসহ মোট ৩ হাজার ২৫৮ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তবে জেলা কৃষি বিভাগের এই ক্ষয়-ক্ষতির তথ্য মানতে নারাজ স্থানীয় কৃষক ও হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের দায়িত্বশীলরা। তাদের দাবি গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারী বৃষ্টি হওয়ায় প্রতিদিনই ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান বাড়ছে।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন ঢাকা পোস্টকে বলেন, হাওরে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে জেলার হাওরের পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সঠিক তথ্য প্রকাশ করেন না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষাবাদ হয়েছে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য ৫ হাজার কোটি টাকা। শ্রমিকদের পাশপাশি জেলায় ধান কাটার যন্ত্র ৬০২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ১৪৬টি রিপার রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জে হাওরের বোরো ফসলরক্ষায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার মাটির ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করেছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি হতে পারে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আগাম বন্যার আশঙ্কা আছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক ঢাকা পোস্টকে বলেন, যে জমিতে ধান ৮০ ভাগ পাকা রয়েছে সেগুলো দ্রুত কাটার জন্য কৃষকদের অনুরোধ করছি। কৃষকরা দিনে-রাতে কাজ করে হাওর থেকে ধান তোলার চেষ্টা করছেন। এখন প্রতিদিনই বৃষ্টি হচ্ছে, ক্ষয়-ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।