ঢাকা ১২:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধুপুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনে আদিবাসী দিবস পালিত

‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও পৃথক মন্ত্রণালয়, ভূমি কমিশনসহ নানা দাবি

মধুপুর করেসপন্ডেন্ট শালবনবার্তাটোয়েন্টিফোরডটকম
  • আপডেট সময় : ১০:০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে

‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ত্রিপক্ষীয় বন জরিপ, বন মামলা প্রত্যাহার, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিতে আলাদা ভূমি কমিশন গঠন এবং প্রাকৃতিক বনে সামাজিক বনায়ন বন্ধসহ নানা দাবি জানিয়েছেন টাঙ্গাইলের মধুপুরের ‘আদিবাসী’ নেতৃবৃন্দ। একই সঙ্গে মধুপুরের বনবাসী আদিবাসীদের ভূমি ও জীবন-জীবিকা নিয়ে কার্যকর ও সম্মানজনক পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

‘আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন’—এ প্রতিপাদ্যে রোববার (৯ আগস্ট) মধুপুরে নানা আয়োজনে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের কর্মসূচিতে এমন দাবি উঠেছে।

জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদসহ জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, উন্নয়ন সংগঠন ও ছাত্র সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে উপজেলার ভুটিয়া উচ্চ বিদ্যালয় এলাকায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শেষে আলোচনা সভায় তারা বক্তৃতায় এসব দাবি করেন।

পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় গারো সংস্কৃতির নানা আয়োজন।

আলোচনা সভায় বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমির অধিকার ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নানা বিষয় তুলে ধরেন।

 

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, তারা ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ কিংবা শুধু ‘জাতিসত্তা’ পরিচয়ে নয়, নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিয়ে বাঁচতে চান। সমতলের প্রায় ২৩ লাখ আদিবাসীর জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা তুলে ধরেন।

মধুপুরের বনাঞ্চল ও বনবাসী মানুষের ভূমির অধিকার প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, বন ও ভূমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিরসনে ত্রিপক্ষীয়ভাবে জরিপ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হয়রানিমূলক বন মামলা প্রত্যাহার, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন এবং প্রাকৃতিক বনে সামাজিক বনায়ন সৃষ্টির কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।

বক্তারা আরও বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, লোকজ জ্ঞান, কৃষিপদ্ধতি এবং বন ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনধারা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিকতার প্রভাব, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং নানা সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসব ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। একটি ভাষা বা সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে শুধু গান, নৃত্য কিংবা পোশাকই হারায় না; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় দীর্ঘদিনের ইতিহাস, জীবনদর্শন, প্রকৃতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ও পূর্বপুরুষদের অর্জিত জ্ঞান।

আলোচনা সভায় জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউজিন নকরেক সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন এসিডিএফ ও ইউসিজিএমের সভাপতি অজয় এ. মৃ।

এতে বক্তব্য দেন আদিবাসী গবেষক ও লেখক থিওফিল নকরেক, অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ জগদিস চন্দ্র বর্মণ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দলের সভাপতি মৃগেন হাগিদক, নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক রোজি রংমা, জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জন জেত্রা, মধুপুর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এমএ রতন হায়দারসহ অনেকে।

 

আলোচনা সভা শেষে আদিবাসী শিল্পীদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গান, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা তুলে ধরা হয়। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে শিল্পীদের পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।

আয়োজকরা বলেন, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের একটি দিন নয়; এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, অধিকার, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে বৃহত্তর সমাজকে সচেতন করার সুযোগ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মধুপুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনে আদিবাসী দিবস পালিত

‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও পৃথক মন্ত্রণালয়, ভূমি কমিশনসহ নানা দাবি

আপডেট সময় : ১০:০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬

‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ত্রিপক্ষীয় বন জরিপ, বন মামলা প্রত্যাহার, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিতে আলাদা ভূমি কমিশন গঠন এবং প্রাকৃতিক বনে সামাজিক বনায়ন বন্ধসহ নানা দাবি জানিয়েছেন টাঙ্গাইলের মধুপুরের ‘আদিবাসী’ নেতৃবৃন্দ। একই সঙ্গে মধুপুরের বনবাসী আদিবাসীদের ভূমি ও জীবন-জীবিকা নিয়ে কার্যকর ও সম্মানজনক পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

‘আদিবাসী জীবন ও ঐতিহ্যগত জ্ঞান সুরক্ষায় এগিয়ে আসুন’—এ প্রতিপাদ্যে রোববার (৯ আগস্ট) মধুপুরে নানা আয়োজনে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের কর্মসূচিতে এমন দাবি উঠেছে।

জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদসহ জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, উন্নয়ন সংগঠন ও ছাত্র সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে উপজেলার ভুটিয়া উচ্চ বিদ্যালয় এলাকায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শেষে আলোচনা সভায় তারা বক্তৃতায় এসব দাবি করেন।

পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় গারো সংস্কৃতির নানা আয়োজন।

আলোচনা সভায় বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমির অধিকার ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নানা বিষয় তুলে ধরেন।

 

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, তারা ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ কিংবা শুধু ‘জাতিসত্তা’ পরিচয়ে নয়, নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিয়ে বাঁচতে চান। সমতলের প্রায় ২৩ লাখ আদিবাসীর জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা তুলে ধরেন।

মধুপুরের বনাঞ্চল ও বনবাসী মানুষের ভূমির অধিকার প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, বন ও ভূমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিরসনে ত্রিপক্ষীয়ভাবে জরিপ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে হয়রানিমূলক বন মামলা প্রত্যাহার, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন এবং প্রাকৃতিক বনে সামাজিক বনায়ন সৃষ্টির কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।

বক্তারা আরও বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, লোকজ জ্ঞান, কৃষিপদ্ধতি এবং বন ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনধারা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিকতার প্রভাব, জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং নানা সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এসব ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। একটি ভাষা বা সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে শুধু গান, নৃত্য কিংবা পোশাকই হারায় না; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় দীর্ঘদিনের ইতিহাস, জীবনদর্শন, প্রকৃতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ও পূর্বপুরুষদের অর্জিত জ্ঞান।

আলোচনা সভায় জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউজিন নকরেক সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন এসিডিএফ ও ইউসিজিএমের সভাপতি অজয় এ. মৃ।

এতে বক্তব্য দেন আদিবাসী গবেষক ও লেখক থিওফিল নকরেক, অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ জগদিস চন্দ্র বর্মণ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দলের সভাপতি মৃগেন হাগিদক, নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক রোজি রংমা, জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জন জেত্রা, মধুপুর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এমএ রতন হায়দারসহ অনেকে।

 

আলোচনা সভা শেষে আদিবাসী শিল্পীদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী গান, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা তুলে ধরা হয়। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে শিল্পীদের পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।

আয়োজকরা বলেন, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের একটি দিন নয়; এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন, অধিকার, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে বৃহত্তর সমাজকে সচেতন করার সুযোগ।