ঢাকা ০৩:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬, ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অমানবিক নির্যাতনে ইরাক থেকে লাশ হয়ে দেশে ফিরল আলমগীর

গোপালপুর করেসপন্ডেন্ট শালবনবার্তাটোয়েন্টিফোরডটকম
  • আপডেট সময় : ০২:৩৬:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬ ৩০ বার পড়া হয়েছে

সুখ ও সচ্ছলতার আশায় সুদূর ইরাকে পাড়ি জমিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার আলমগীর। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেখানে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয় তাকে। দীর্ঘ চার মাস আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে দেশে ফিরেছে তার মরদেহ।

আলমগীর হোসাইন গোপালপুর উপজেলার ধোপাকান্দি ইউনিয়নের পঞ্চাশ গ্রামের বাসিন্দা মো. আবুল হোসেনের একমাত্র ছেলে।

স্বজনরা জানান, জীবিকার তাগিদে ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট আলমগীর পাড়ি জমান ইরাকে। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, বিদেশে গিয়ে ভালো চাকরি ও উচ্চ বেতনের মাধ্যমে পরিবারের ভাগ্য বদলাবেন তিনি। একই সঙ্গে ওই এলাকার রিফাত আকন্দও ইরাকে যান।

পরিবারের অভিযোগ, বাংলাদেশি এক দালালের মাধ্যমে ইরাকে পৌঁছানোর পর আলমগীর ও তার সঙ্গীদের আরেকটি দালাল চক্র ‘গেমঘড়’ নামক একটি আস্তানায় নিয়ে যায়। সেখানে একটি বাড়িতে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন লোককে অমানবিক পরিবেশে আটকে রাখা হতো। পরে তাদের বিভিন্ন মালিকের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের বরাতে জানা যায়, দুই বা চার বছরের চুক্তির কথা বলে তাদের দিয়ে দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হতো। কাজ করতে না চাইলে মারধর ও অমানবিক নির্যাতন করা হয় তাদের। এমনকি মাস শেষে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেতনের অর্ধেক দেওয়া হতো।

এই অমানবিক পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে আলমগীর, রিফাত আকন্দসহ আরও দুইজন গ্রিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় আরেক দালাল চক্র গ্রিসে পাঠানোর কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে প্রথমে ৮ লাখ টাকা এবং পরে আরও ৪ লাখ টাকা নেয়। মোট ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর তাদের কুর্দিস্তান-ইরাক সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

পরিবারের ভাষ্যমতে, সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে দালালরা তাদের একটি বরফশীতল নদীতে নামতে বাধ্য করে। আলমগীর নদী থেকে উঠে আসার পর তাকে মারধর করা হয় এবং একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি আলমগীর মারা যান বলে পরিবার নিশ্চিত করেছে। এ দৃশ্য দেখে বাকি দুজন নদী সাঁতরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও আলমগীরের সফরসঙ্গী রিফাত আকন্দ নদীতে নিখোঁজ হন। এখন পর্যন্ত তার জীবিত বা মৃত কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, মারা যাওয়ার পর দালাল চক্র আলমগীরের লাশ একটি গোপন স্থানে রেখে দিনের পর দিন পরিবারকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পর পরিবারের কাছে তার মৃত্যুর খবর জানানো হয়।

পরে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সহযোগিতায় বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে আলমগীরের মরদেহ দেশে আনা হয়। ২০২৬ সালের ৬ মে তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।

পরিবারের দাবি, মামুন, সম্রাট ও আমি নামের কয়েকজন ব্যক্তি এই দালাল চক্র পরিচালনা করেন। এদের মধ্যে সম্রাটের বাড়ি কুষ্টিয়া জেলায় বলে জানা গেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অমানবিক নির্যাতনে ইরাক থেকে লাশ হয়ে দেশে ফিরল আলমগীর

আপডেট সময় : ০২:৩৬:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

সুখ ও সচ্ছলতার আশায় সুদূর ইরাকে পাড়ি জমিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার আলমগীর। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেখানে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয় তাকে। দীর্ঘ চার মাস আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে দেশে ফিরেছে তার মরদেহ।

আলমগীর হোসাইন গোপালপুর উপজেলার ধোপাকান্দি ইউনিয়নের পঞ্চাশ গ্রামের বাসিন্দা মো. আবুল হোসেনের একমাত্র ছেলে।

স্বজনরা জানান, জীবিকার তাগিদে ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট আলমগীর পাড়ি জমান ইরাকে। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, বিদেশে গিয়ে ভালো চাকরি ও উচ্চ বেতনের মাধ্যমে পরিবারের ভাগ্য বদলাবেন তিনি। একই সঙ্গে ওই এলাকার রিফাত আকন্দও ইরাকে যান।

পরিবারের অভিযোগ, বাংলাদেশি এক দালালের মাধ্যমে ইরাকে পৌঁছানোর পর আলমগীর ও তার সঙ্গীদের আরেকটি দালাল চক্র ‘গেমঘড়’ নামক একটি আস্তানায় নিয়ে যায়। সেখানে একটি বাড়িতে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন লোককে অমানবিক পরিবেশে আটকে রাখা হতো। পরে তাদের বিভিন্ন মালিকের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের বরাতে জানা যায়, দুই বা চার বছরের চুক্তির কথা বলে তাদের দিয়ে দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হতো। কাজ করতে না চাইলে মারধর ও অমানবিক নির্যাতন করা হয় তাদের। এমনকি মাস শেষে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেতনের অর্ধেক দেওয়া হতো।

এই অমানবিক পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে আলমগীর, রিফাত আকন্দসহ আরও দুইজন গ্রিসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় আরেক দালাল চক্র গ্রিসে পাঠানোর কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে প্রথমে ৮ লাখ টাকা এবং পরে আরও ৪ লাখ টাকা নেয়। মোট ১২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর তাদের কুর্দিস্তান-ইরাক সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

পরিবারের ভাষ্যমতে, সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে দালালরা তাদের একটি বরফশীতল নদীতে নামতে বাধ্য করে। আলমগীর নদী থেকে উঠে আসার পর তাকে মারধর করা হয় এবং একপর্যায়ে তাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি আলমগীর মারা যান বলে পরিবার নিশ্চিত করেছে। এ দৃশ্য দেখে বাকি দুজন নদী সাঁতরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও আলমগীরের সফরসঙ্গী রিফাত আকন্দ নদীতে নিখোঁজ হন। এখন পর্যন্ত তার জীবিত বা মৃত কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগ রয়েছে, মারা যাওয়ার পর দালাল চক্র আলমগীরের লাশ একটি গোপন স্থানে রেখে দিনের পর দিন পরিবারকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পর পরিবারের কাছে তার মৃত্যুর খবর জানানো হয়।

পরে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সহযোগিতায় বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে আলমগীরের মরদেহ দেশে আনা হয়। ২০২৬ সালের ৬ মে তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।

পরিবারের দাবি, মামুন, সম্রাট ও আমি নামের কয়েকজন ব্যক্তি এই দালাল চক্র পরিচালনা করেন। এদের মধ্যে সম্রাটের বাড়ি কুষ্টিয়া জেলায় বলে জানা গেছে।